তারুণ্যের উচ্ছল প্রাণবন্যায় ভরপুর প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। প্রাণাধিক প্রিয় জন্মভূমি যখনই আক্রান্ত হয়েছে তখনই দুই হাত মেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে এসেছে সেই তারুণ্য। আর তরুণদের মূল অংশই হলো ছাত্রসমাজ। স্বৈরশাসনের কবল থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পেয়েছিলো ছাত্রসমাজের দুঃসাহসিক অদম্য ভূমিকার মাধ্যমে। সোনালি অতীত বহনকারী এ ছাত্রসমাজের ইতিহাসের পাতায় যখন কলঙ্কের কালিমা লেপন করছিলো ক্ষমতালোভী স্বার্থান্বেষী শাসক মহল, আলোর মশাল হাতে অন্ধকার জয় করতে তখনই যাত্রা শুরু করে ইসলামী ছাত্রশিবির। তরুণ ছাত্রসমাজ হলো দেশ, জাতি, সমাজ ও সভ্যতা বিনির্মাণের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি।
ছাত্রসমাজের মূূল্যবোধ, দেশপ্রেম ও নৈতিক মানদণ্ড অর্জনের ওপর দেশ ও জাতির ভালো-মন্দ নির্ভর করে। জাতির প্রত্যাশা পূরণে নৈতিকতাসম্পন্ন দেশপ্রেমিক তারুণ্যের প্রয়োজন অপরিসীম। নানান সমস্যায় জর্জরিত এই দেশের মানুষ প্রাচীনকাল থেকে বারবার স্বাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সকল আন্দোলন ও সংগ্রামের লক্ষ্য ছিল বাংলার সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বাধীনতা। বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) ও বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১) এবং ভারত-পাকিস্তান নামে পৃথক রাষ্ট্রগঠনও (১৯৪৭) এ দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তি এবং প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে পারেনি। আবারো ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেয় এ দেশের সাধারণ জনগণ।
কিন্তু যে প্রত্যাশায় এসব আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও তা পূরণ হয়নি। দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি আজও। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এখনও অনেকটা অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র রয়ে গেছে কার্যত তাত্ত্বিক পর্যায়ে। সুশাসন তো দূরের কথা, প্রচলিত আইনের শাসনও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, জবর দখলসহ নানান সব নেতিবাচক দিক ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এখনও শৃঙ্খলিত। পরমত সহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের একটি মৌলিক শর্ত হলেও তার বিকাশ রুদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের প্রকৃত দায়িত্ব পালনে যথাযথ ভূমিকা রাখছে না, বরং সেগুলো গণমানুষের প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশেষ দলের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। কৃষক তাদের উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। মেধাবীদের মেধার যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না বরং দলীয় লেজুড়বৃত্তি বেড়ে চলেছে ক্রমশ।
মাদকদ্রব্য ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণের ফলে মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতার সর্বগ্রাসী অবক্ষয় সমগ্র তরুণ সমাজকে বিপথগামী করছে। বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জাতির সামনে। এই চ্যালেঞ্জ তারাই মোকাবেলা করতে পারবে যাদের ইচ্ছাশক্তি সূর্যের মতো প্রখর, বিশ্বাস যাদের পাহাড়ের মতো অটল। বহু গুণে গুণান্বিত বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অগ্রসেনানী। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার জন্য সৎ ও যোগ্য লোক তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। ছিল না দেশ পরিচালনার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য। ছাত্ররাই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ হলেও তাদেরকে দেশগঠনের উপযোগী করে তোলার কোনো পথ তখন ছিল না।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠা ছিল তৎকালীন সময়ের এক অনিবার্য দাবি। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সামগ্রিক প্রেক্ষাপট এ ধরনের একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ অনিবার্য করে তোলে। এমতাবস্থায় দেশগঠনের জন্য সৎ, যোগ্য, মেধাবী, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের বিকাশ এবং ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের মহান ও পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমার।
আল্লাহর এ জমিনে সকল প্রকার জুলুম ও নির্যাতনের মূলোচ্ছেদ করে আল কুরআন ও আল হাদিসের আলোকে ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ের সৌধের ওপর এক আদর্শ ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার মহান ও পবিত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলাম অর্থ শান্তি আর শিবির অর্থ তাঁবু; প্রকৃত অর্থে ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছাত্রদের তাঁবু বা ঘাঁটি হচ্ছে ইসলামী ছাত্রশিবির। ছাত্রশিবির আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার এক অপ্রতিরোধ্য কাফেলার নাম। সৎ, যোগ্য ও আল্লাহভীরু নেতৃত্বের উৎসস্থল হচ্ছে ছাত্রশিবির। অন্যায়, অসত্য ও জীর্ণতার বিরুদ্ধে শিবির হচ্ছে একটি চলমান সাইক্লোন। বিজয়ের জয়গান গায় ছাত্রশিবির। মেধাবী ছাত্রদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান এ সংগঠন। নতুন আবিষ্কারের উৎসাহে উদ্বেল ছাত্রশিবির। যেখানে মেধা, মননশীলতা আর মূল্যবোধের জয়গান সেখানেই ছাত্রশিবির।