আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ছাত্রদের মাঝে ইসলামের আহ্বান পৌঁছিয়ে তাদেরকে সাথে নিয়ে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের পথে অটল অবিচলভাবে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল শুরু থেকেই। প্রত্যাশায় ছিল এবং আছে- এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। শুরু থেকেই আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের পানে চেয়ে শিবিরের পথচলা ছিল দুর্দম, দুর্দান্ত ও অবিচল। ইসলামবিরোধী শক্তি ছাত্রশিবিরের আত্মপ্রকাশ ও এগিয়ে চলাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। যাত্রার শুরু থেকেই ছাত্রশিবিরকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য চক্রান্ত শুরু করে তারা। ছাত্রশিবিরের ওপর বাতিল শক্তি চালিয়েছে অত্যাচার, অবিচার, জেল, জুলুম, নির্যাতন, নিষ্পেষণ, অপপ্রচার ও হত্যাযজ্ঞ। কোনভাবেই তারা ছাত্রশিবিরকে এগোতে দিতে চায়নি। সকল ভ্রুকুটিকে উপেক্ষা করে গাঢ় তমসার পথ চিরে চিরে আল্লাহর অশেষ রহমতে আজ এক প্রত্যাশার নোঙরে এসে দাঁড়িয়েছে ছাত্রশিবির।
সকল বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে ছাত্রশিবির এগিয়ে যেতে থাকলে বিরোধীরা নবীন এ সংগঠনটিকে কুঁড়িতেই নিঃশেষ করার জন্য বৃহৎ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পরিকল্পনা করে ১৯৮২ সালের ১১ই মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই দিন ইসলামবিরোধী শক্তির হাতে প্রাণ হারান আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ সাব্বির, হামিদ, আইউব ও আব্দুল জব্বার। সেদিন থেকেই বাংলাদেশের ইসলামপ্রিয় ছাত্রসমাজ এ দিনটিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
১৯৮২ সালের ১১ মার্চ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আহবান করে নবাগত ছাত্রসংবর্ধনা অনুষ্ঠান। চারদিক থেকে শত শত ছাত্রশিবিরকর্মী গগনবিদারী শ্লোগান দিতে দিতে অনুষ্ঠানস্থলে আসতে থাকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরাও পাশের শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। তাদের হাতে ছিল হকিস্টিক, রামদা, বর্শা, ফালা, ছোরা, চাইনিজ কুড়াল ইত্যাদি ধারালো অস্ত্র। শিবিরের সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হলে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা বারবার অনুষ্ঠান পণ্ড করার জন্য উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। শিবির নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত ধৈর্যের সাথেই সংঘর্ষ এড়িয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যান।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকা থেকে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরাও শহীদ মিনারে সমবেত হতে থাকে। একপর্যায়ে নবাগত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে চতুর্দিক থেকে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। শিবিরকর্মীরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যায়। পরবর্তীতে সন্ত্রাসীরা আবারো সংগঠিত হয়ে হামলা চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলতে থাকে। এ সময় শহর থেকে ট্রাকভর্তি বহিরাগত অস্ত্রধারীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগ দেয়। শুরু হয় আরো ব্যাপক আক্রমণ। সন্ত্রাসীদের আক্রমণের প্রচণ্ডতায় নিরস্ত্র শিবিরকর্মীরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। আত্মরক্ষার জন্য শিবিরকর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঘঈঈ ভবন ও কেন্দ্রীয় মসজিদে আশ্রয় গ্রহণ করে। কিন্তু সেখানেও হায়েনাদের থাবা থেকে রেহাই পায়নি আমাদের ভাইয়েরা। সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মসজিদ ও BNCC ভবনে আশ্রয় নেয়া নিরীহ শিবিরকর্মীদের ওপর পাশবিক কায়দার হত্যায় মেতে ওঠে।
সন্ত্রাসীদের আঘাতে শহীদ সাব্বির আহম্মেদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে সন্ত্রাসীরা তাঁর বুকের ওপর পা রেখে তাঁর মাথার মধ্যে লোহার রড ঢুকিয়ে দেয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে সমস্ত শরীর। হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শহীদ আব্দুল হামিদ ভাইকে চরম নির্যাতনের সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে সন্ত্রাসীরা একটি ইট মাথার নিচে দিয়ে আর একটি ইট দিয়ে মাথায় আঘাতের পর আঘাত করে তার মাথা ও মুখমণ্ডল থেঁতলে দেয়; ফলে তার মাথার মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তাক্ত আব্দুল হামিদের মুখমণ্ডল দেখে চেনার কোনো উপায় ছিল না। ১২ মার্চ রাত ৯টায় তিনি শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করেন। শহীদ আইয়ুব ভাই শাহাদত বরণ করেন ১২ মার্চ রাত ১০টা ৪০ মিনিটে। দীর্ঘ কষ্ট ভোগের পর ২৮ ডিসেম্বর রাত ১১টা ৪০ মিনিটে নিজ বাড়িতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন শহীদ আব্দুল জব্বার ভাই। তাদের এ নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়।
শিবিরকর্মীদের আর্তচিৎকার আর আহাজারিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠলেও কসাইদের পাষাণ হৃদয় এতটুকুও স্পর্শ করতে পারেনি। এ নরপশুরা দীর্ঘ সময় ধরে মৃত্যুর বিভীষিকা সৃষ্টি করলেও মাত্র অল্প দূরত্বে অবস্থানরত পুলিশবাহিনী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতেও এগিয়ে আসেনি। এমনকি আহত রক্তাক্ত মৃত্যুপথযাত্রী শিবিরকর্মীদের উদ্ধার করতেও কোনো ভূমিকা পালন করেনি।
নির্মম এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামবিরোধী বাম সংগঠনগুলো ছাত্রশিবিরকে চিরতরে বাংলার জমিন থেকে মুছে দিতে চেয়েছিলো। যুগে যুগে কোন তৌহিদবাদীকে অত্যাচার-জুলুম করে থামানো যায়নি, নিঃশেষ করা যায়নি। ছাত্রশিবিরকেও দমাতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। কারণ ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা ইসলামের জন্য সর্বদা জীবন দিতে প্রস্তুত। তারা জানে জীবনের চেয়ে শাহাদাতের মর্যাদা অনেক বেশি। তারা শহীদ সুমাইয়া, আমীর হামযা আর মুসআব (রা) এর পথে চলার জন্যই এগিয়ে চলে। শাহাদাত কতোইনা মর্যাদার।