‘আমরা কোথা থেকে এসেছি, এই পৃথিবীতে আমাদের উদ্দেশ্য কি এবং মৃত্যুর পর কি হবে?’ - প্রত্যেকটি মানুষকে তার জীবদ্দশায় সচেতন বা অবচেতনভাবে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হয়। মানুষ যখন তার নিজের নৈতিক স্বজ্ঞার উপর চিন্তা করে তখন তার মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রশ্ন আসার কথা যে, তার মধ্যকার কিছু মৌলিক বিষয়ে ভালোমন্দের বোধ কিভাবে এল? এটা কেবলই বিবর্তনের অন্ধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়ার কথা নয় কারণ তত্ত্বগতভাবে তা প্রাণীর মধ্যে কেবল সবচেয়ে কার্যকর উপায়ে জৈবিকভাবে টিকে থাকা ও পুনরুৎপাদন করার অনুকূল বৈশিষ্ট্যসমূহ সৃষ্টি করে, যা স্বভাবতই মানুষের মধ্যে আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরী করার কথা। আবার এই নৈতিকবোধ কেবল সামাজিক পরিবেশের মাধ্যমেও তৈরী হতে পারে না কেননা, সামাজিক পরিবর্তনের ফলে নৈতিক মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটে। আর স্থায়ীত্ব ছাড়া নৈতিকতা এর অর্থ ও আবেদন হারায়।
নৈতিকতার ব্যাপারে উপরোক্ত ধারণাদ্বয় পোষণ করলে নৈতিকতা তার নৈর্ব্যক্তিকতা ও সার্বজনীনতা হারাবে। ফলে মানুষের অন্তরে নৈতিক মূল্যবোধ মেনে চলার স্ব-প্রণোদনা অন্তর্হিত হবে। তাই মানুষের এই নৈতিকবোধের একটা সুগভীর অর্থ রয়েছে। মানবমন অবচেতনভাবেই অনুভব করে যে, নৈতিকতার একটি নৈর্ব্যক্তিক মাপকাঠি এবং নৈতিকতা অর্থবহ হয়ে ওঠার জন্য একটি চূড়ান্ত জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মানুষ যখন তার চারপাশের বিশ্বব্রহ্মান্ড এবং নিজেদের দিকে তাকায় তখন সৃষ্টির বিশালতা, সূক্ষ্মতা ও পরিপূর্ণতা দেখে তার স্বজ্ঞাই বলে উঠে এই মহাবিশ্বের একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি পরাক্রমশালী এবং মহাপ্রজ্ঞাময়।
আমাদের আবাসভূমি পৃথিবী ও এর চারপাশের গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করলে আমরা বুঝতে পারি এই পৃথিবীকে মানবজাতির বাসোপযোগী করে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, মহাবিশ্বের পরাক্রমশালী সৃষ্টিকর্তা আমাদের প্রতি উদাসীন নন, বরং আমাদের সর্বোচ্চ কল্যাণকামী। এই সৃষ্টিকর্তাই মূলত নৈতিকতার চূড়ান্ত উৎস হওয়া মানায় এবং এজন্যই তাঁর কাছেই আমাদের জীবনের ছোট-বড়, খুঁটিনাটি সকল নৈতিক সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিতা করাই যৌক্তিক হতে পারে। খোদাপ্রদত্ত হওয়ার কারণেই নৈতিক বিধান ও নৈতিকতা নৈর্ব্যক্তিকতা, সার্বজনীনতা, যৌক্তিকতা ও রূহানী আবেদন সৃষ্টি করতে পারে।
প্রত্যেক মানুষের মধ্যে বড় বড় মৌলিক বিষয়ে নৈতিক স্বজ্ঞা সৃষ্টির পাশাপাশি মানবজাতির ইতিহাসের সূচনা থেকেই খোদাতায়ালা মানুষকে বিস্তারিত নৈতিক দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য প্রতিটি জনপদে যুগে যুগে মানুষের মধ্য থেকেই শিক্ষক প্রেরণ করেছেন, যাঁরা নবী ও রাসূল হিসেবে পরিচিত। নবী-রাসূলদের শিক্ষা মানুষের নৈর্ব্যক্তিক, সুস্থ ও সার্বজনীন নৈতিক স্বজ্ঞার সাথে পূর্ণাঙ্গরূপে সামঞ্জস্যশীল।
মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সভ্যতাগত ক্রমবিকাশের সাথে সাথে একসময় নবী-রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ কমতে থাকে। একসময় মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্কতা এতটা দূর পৌঁছায় যে, সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে মোহাম্মদ (সা)-কে সমগ্র বিশ্বের জন্য মানবসভ্যতার শেষ দিন পর্যন্ত প্রেরণ করা হয় এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ প্রদত্ত একমাত্র দ্বীন ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে। মহানবী (সা)-এর ওফাতের পর সমগ্র মুসলিম উম্মাহর উপর বিশ্বকে পথপ্রদর্শনের নববী দায়িত্ব সামগ্রিকভাবে অর্পিত হয়েছে।
বর্তমান আধুনিক পুঁজিবাদী ও বস্তুবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ধর্মের রূহানীয়াত অনুপ্রাণিত নৈতিকতা হ্রাস পেয়েছে। জনপরিসরে যে বাহ্যিক নৈতিকতা দেখা যায় তা এক ধরনের নাগরিক নৈতিকতা (civic morality), যা বড় দাগে প্রযুক্তিগত নজরদারি ও সুসজ্জিত আধুনিক আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত। ব্যক্তিগত পরিসরে মানুষ ভোগ-বিলাসের পিছনে ছুটছে ক্রমাগত, সেখানে তা করা বৈধও যতক্ষণ না সে অন্য কাউকে দৈহিকভাবে ক্ষতি না করছে। আর না ব্যক্তিপরিসরে নৈতিকতাকে কোনভাবে প্রচার করার কোন বালাই আছে সমাজ ও রাষ্ট্রের। এর ফলে যখনই রাষ্ট্রীয় নজরদারি ঢিলা হয়ে যায় তখন অনেকসময় মানুষের পাশবিক দিকটি বেরিয়ে আসে। এর পেছনে রয়েছে পশ্চিমা দেশসমূহে কর্তৃত্বশালী সেক্যুলারিজম, যাকে কয়েক শতক ধরে পশ্চিমে স্বাভাবিকীকরণ করা হয়েছে।
খ্রিষ্টবাদের ব্যাপারে মোহভঙ্গের কারণেই পশ্চিমা সভ্যতার রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে সেক্যুলার হয়ে উঠে। পশ্চিমা বিশ্ব বস্তুগতভাবে এগিয়ে গেলেও ধর্ম জীবনের যে উচ্চতর অর্থ ও উদ্দেশ্য প্রদান করতে সক্ষম ছিল, বিজ্ঞান ও দর্শন তা প্রদানে অক্ষম। ফলে মানুষ জীবনের উচ্চতর অর্থ ও উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলে। বস্তুবাদী উন্নতিই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের নামে সমাজে ছড়িয়ে পড়ে আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতা। ফলে পরিবার ও সমাজে নৈতিক নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়ে। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে। ক্যাথলিক চার্চের বাড়াবাড়ি, চার্চ ও সম্রাটদের সংঘাত, রিফর্মেশন পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন খ্রিষ্টীয় ফেরকার মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ইত্যাদি কারণে পশ্চিমে সেক্যুলারিজম গেড়ে বসে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, সেক্যুলারিজম পশ্চিমা সভ্যতার একটি ঐতিহাসিক প্রডাক্ট।
পশ্চিমা বিশ্ব উপনিবেশায়নের মাধ্যমে ধর্মহীন সেক্যুলার পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের উপর চাপিয়ে দিলেও তা মুসলিম বিশ্বকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারে নি; তবে তদঞ্চলে কর্তৃত্বশীল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মুসলিম সমাজেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কলোনিয়াল শিক্ষাব্যবস্থা এখনো জারী থাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে শিক্ষার্থীরা উপযোগতাবাদী আত্মকেন্দ্রিক জীবনবোধ নিয়ে কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশেও সামাজিক বন্ধন ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে। স্বার্থপরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মানুষজন টাকা-পয়সা, পার্থিব বিলাসিতা, আরাম-আয়েশকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলছে। ৯০% মুসলিম জনপদে ইসলাম হয়ে পড়েছে কেবল বাপ-দাদা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সাংস্কৃতিক উপকরণ মাত্র। ফলে অন্যান্য তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মত বাংলাদেশেও মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে বেড়েছে অপরাধের মাত্রা। মূল্যবোধ অবক্ষয়ের এই লাগাম টেনে ধরতে হলে আমাদের অবশ্যই ইসলামের দিকেই ফিরে যেতে হবে এবং একে কেবল বাপ-দাদার ধর্ম না ভেবে গভীরভাবে বুঝতে হবে এবং পরিপূর্ণ বোধ ও আবেগের সাথে ইসলামকে আঁকড়ে ধরতে হবে।
ইসলামের বার্তা খুবই সহজ-সরল কিন্তু গভীর। ইসলাম বলে, যে পরাক্রমশালী খোদাতায়ালা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে সৃষ্টিজগতের সেরা জীব ও তাঁর খলিফা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। এই পৃথিবীতে মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত করা। কোরআনে এরশাদ হচ্ছে:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি” [সূরা যারিয়াত: ৫৬]
কিন্তু ইবাদত কেবলমাত্র নামাজ, যাকাত, রোযা, হজ্জের মত কয়েকটি কাঠামোবদ্ধ রসম-রেওয়াজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের পুরো জীবনটাই ইবাদত যতক্ষণ মানুষ খোদাভীরুতা এবং তাঁর সামনে জবাবদিহিতার বোধ রেখে কাজ করে যায়। মানুষ এই পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে বিচরণ করবে, একে আবাদ করবে এবং আসমান ও যমীনের রহস্য উন্মোচন করবে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হয়ে। এর সবটাই হবে ইবাদত।
‘জীবন হতে হবে ইবাদত’ - এই কোরআনী ধারণাই মানবঅস্তিত্ব ও নৈতিকতাকে গভীরভাবে অর্থবহ করে তোলে। সেই সাথে খোদাতায়ালা ওহীর মাধ্যমে নিজের যে নৈতিক ইচ্ছার কথা পেশ করেছেন তিনি চান মানুষ সেই খোদায়ী ইচ্ছাকে নিজের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে কায়েম করুক। মুসলিম উম্মাহ সেই দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে পৃথিবীতে ইনসাফ ও তাক্বওয়াবান সমাজ গঠনে আদিষ্ট।