This website is under construction
Glorious History

উপমহাদেশের রাজনীতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় অবস্থান। বিশেষত বাংলাদেশের রাজনীতিতে, প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাসে রয়েছে ছাত্র সংগঠনসমূহের ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ভূমিকা। এমনই একটি আদর্শবাদী ছাত্র সংগঠন হলো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, যা ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে তার যাত্রা শুরু করে। ৪৮ বছর ধরে এটি একটি গঠনমূলক, লেজুড়বৃত্তিমুক্ত ছাত্র সংগঠন হিসেবে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবিরের রয়েছে স্বতন্ত্র‍ গৌরবজ্জল সংগ্রাম ও অর্জনের ইতিহাস।

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবির

ছাত্রসংগঠন হওয়ায় শিক্ষাঙ্গনেই ছাত্রশিবির তার মূল কার্যক্রম চালায়। শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, লেজুড়বৃত্তিক ও দখলদারি রাজনীতি বন্ধ, দেশের জন্য আদর্শ ও ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষার্থী তৈরিসহ ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ছাত্রশিবির নিরবচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। প্রতি বছর ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ১৫ আগস্টকে “ইসলামী শিক্ষা দিবস” হিসেবে পালন করে থাকে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০০২ সালে দেশব্যাপী শিক্ষা সপ্তাহ পালন করা হয় শিবিরের উদ্যোগে। এ উপলক্ষে ঢাকায় জাতীয় বিজ্ঞানমেলা, জাতীয় সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভা, মেধাবী ছাত্রদের সমাবেশে শিক্ষামন্ত্রীর সরাসরি প্রশ্নোত্তর, শিক্ষাসামগ্রী প্রদর্শনী এবং “আমাদের শিক্ষাসঙ্কট : উত্তরণের উপায়” শীর্ষক বুকলেট প্রকাশসহ বহুবিধ প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, লেজুড়বৃত্তি, দখলদারি, দুর্নীতি দূরীকরণে অনেক আন্দোলন ও সচেতনামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে ছাত্রশিবির। বিশেষত জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণভ্যুত্থানের পর থেকে ছাত্রশিবির দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে সবচেয়ে সক্রিয় ছাত্রসংগঠন হিসেবে কাজ করে ক্রমান্বয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা

ছাত্রশিবির সব সময় শিক্ষাঙ্গনে হল দখল, ভর্তি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, শিক্ষক লাঞ্চনা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান ধারণ করে এসেছে। নিজস্ব জনশক্তি ও শক্তির আলোকে এসকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ১৯৮২ সালে ১১ মার্চ ছাত্রশিবির কর্তৃক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাবলা চত্বরে নবাগতদের নিয়ে আয়োজত নবীনবরণ অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন মিলে হামলা করে ছাত্রশিবিরের চারজন ভাইকে শহীদ করে –সেই থেকে শুরু। ছাত্রশিবিরের সাড়া ফেলানো বিভিন্ন ইতিবাচক কার্যক্রম, শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্রবর্ধমান জনপ্রিয়তার মুখে আদর্শিকভাবে শিবিরকে মোকাবেলা করতে না পেরে কিছু ছাত্রসংগঠন শিবিরের বিরুদ্ধে হামলা, হত্যাকান্ড, অপপ্রচার ইত্যাদির আশ্রয় নেয়। এছাড়াও সকল ধরণের লেজুড়বৃত্তি, ক্যাম্পাস দখলের কালচার ও পেশি শক্তি অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবির সর্বদা দৃঢ়পদ থাকায় সব সময় সন্ত্রাসী ও জালেম শক্তির চক্ষুশূল ছিল। ১৯৯০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সমর্থিত প্যানেলের প্রচারণা মিছিলে বোমা হামলা চালানো হয়। এভাবে শিবিরকে সর্বদা মোকাবেলা করতে হয়েছে সন্ত্রাসবাদের।

শহীদি তামান্না নিয়ে শহীদি যাত্রা

বিনা উস্কানিতে ১৯৮২ সালের ১১ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার চত্বরে ইট দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে মাথা থেতলিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় প্রিয় ভাই সাব্বির, হামিদ, আইয়ুব এবং জব্বারকে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস মোকাবেলা করতে গিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আগ পর্যন্ত শিবিরকে হারাতে হয় ২৩৪ জনকে। জুলাই বিপ্লবে শহীদদের একটি বড় অংশ নিজস্ব জনশক্তি। যদিও ছাত্রশিবির মনে করে এই বিপ্লবের শহীদদেরকে দলীয় পরিচয়ে পরিচিত করা উচিত না। এই বিপ্লবেরর সকল শহীদকেই শিবির সকলের হিসেবে মনে করে এবং তাই সকল শহীদকে ধারণ করে, সর্বদা স্মরণ করে। শুধু শাহাদাতই নয়, গুমও হয় শিবিরের অনেকে। ২০০৯-২০২৪ সালের আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে ছাত্রশিবিরের অনেকে গুম হয়ে আর ফিরে আসেনি।

ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির

ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ছাত্রশিবির দেশের পাবলিক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে প্রায় সবগুলোতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ছাত্রশিবির ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ১৯৮০ সালে খুলনা আজম খান কমার্স কলেজে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদে, ১৯৮১ সালে হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজে এবং একই বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়। ১৯৮৬ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ১৭টি পদের মধ্যে ১২টিতে বিজয়ী হয়। এরপর থেকে রাকসু, চাকসুসহ বিভিন্ন সময়ে ক্যাম্পাসগুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনে শিবির অংশ নিয়েছে এবং আল্লাহর রহমতে পূর্ণ বা আংশিক প্যানেলে বিজয় অর্জন করেছে এবং ছাত্রসমাজের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমানতদারিতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছে।

স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন

১৯৮২ সালে নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে প্রথমে পরোক্ষভাবে এরপর প্রত্যক্ষভাবে ক্ষমতা দখল করে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ। এরপর দেশে ৮ বছর বিরাজ করে এরশাদের স্বৈরতন্ত্র। এদেশের ছাত্রসমাজ শুরু থেকেই স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে থাকে। এক পর্যায়ে ছাত্রদের সাথে সাধারণ জনগণ রাস্তায় নেমে এসে লাগাতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার এরশাদকে হটায়। ছাত্রশিবিরও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আন্দোলনে ছাত্রশিবির কার্যকর ভূমিকা রাখে।

সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সমূহে ছাত্রশিবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির জন্মের পর থেকে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত শিবিরকে স্বৈরাচারের জাতীয় স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপসমূহের প্রতিবাদ করতে হয়েছে, চালিয়ে যেতে হয়েছিল ক্রমাগত আন্দোলন এরশাদের পতনের পর সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলে এদেশের সাধারণ জনগণ আশা করেছিল তখন থেকে দেশ একটি স্থিতিশীল ও পূর্ণ গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বিভিন্ন পক্ষ ও গঠিত সরকারগুলো নিজেদের হীন স্বার্থে বিভিন্ন সময় দেশের জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রায়ই হয় নানা আন্দোলন। তাই ১৯৯১-র গণঅভ্যুত্থানের ফলে গণতান্ত্রিক পটপরিবর্তনের পর আবারও শিবিরকে রাজপথে নামতে হয়েছে জাতীয়তাবাদী দলের স্বৈরাচারী ভূমিকার বিরুদ্ধে ১৯৯৪-৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলনে শিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯৬-এর পটপরিবর্তন পর আওয়ামী দুঃশাসন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে আন্দোলন চলছে এখানেও শিবিরের ভূমিকা সক্রিয়। জাতীয় ইস্যু-সমূহের নামে উল্লেখযোগ্য ছিলো বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের ধর্মদ্রোহিতার বিরুদ্ধে জনমত তৈরি, কুদরত-এ-খোদা সেকুলার শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতাসহ, ফতোয়া নিয়ে হীন রায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ২০০০-২০০১ এর হাসিনা হটাও আন্দোলন ইত্যাদি। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালে সালে আওয়ামী একদলীয় স্বৈরাচারে রূপ নিলে দেশের অন্যসব ছাত্রসংগঠনসহ শিবির গড়ে তুলে “সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য”। ২০০৫-এ শিবির সার্ক শীর্ষ সম্মেলন নিয়ে গড়ে ওঠা অস্থিতিশীল ও দোদুল্যমান পরিস্থিতি এবং ৬৩ জেলায় চেইন বোমা হামলার ঘটনার পর দেশের সচেতন দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদদের নিয়ে আয়োজন করেছে গোলটেবিল বৈঠকের। এ আয়োজন ও আলোচনা দেশ ও জাতিকে নতুন আশায় উজ্জ্বীবিত করেছিলো। ছাত্রশিবির প্রতিটি আন্দোলনে জনগণের সাথে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরই প্রতিশোধে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর আওয়ামী ও তার সহযোগী দগুলোর যৌথ আক্রমণে শিবির হারায় ৮ টি তাজা প্রাণ। এরপর এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৫ বছর মেয়াদী ফ্যাসিবাদি শাসন এবং এই পুরো ফ্যাসিবাদের আমল জুড়ে ফ্যাসিস্ট শক্তির মূল টার্গেট ছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। একই সাথে ১৫ বছরব্যাপী ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল আন্দোলনে ছাত্রশিবির থাকতো ফ্রন্ট লাইনে। সর্বশেষ জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিলোপ ঘটে। এই বিপ্লবেও ছাত্রশিবিরই রাখে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

২৮ এ অক্টোবরের ঘৃণ্য হত্যাকান্ড

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে দেশবিরোধী শক্তি অনুধাবন করতে পারে যে দেশের বিদ্যমান ইসলামি শক্তির সাথে বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের বিরুদ্ধে তাদের দেশবিরোধী চক্রান্তের ব্যর্থতা অনিবার্য। উল্লেখ্য ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবির সকল আসনে বাংলাদেশপন্থী প্রার্থীদের জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালায়, যা নির্বাচনী ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেই থেকে দেশবিরোধী শক্তিরা যৌথভাবে দেশের গণতন্ত্রকে, বাংলাদেশপন্থী শক্তির ঐক্যকে নস্যাৎ করতে পরিকল্পনা শুরু করে। তাদের এই হীন পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২০০৬ সালের ২৮ এ অক্টোবর তৎকালীন জোট সরকারের শেষ দিনে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশের ডাকা পৃথক মহাসমাবেশের দিন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ঢাকায় লগি-বৈঠা আন্দোলনের ডাক দেয়। পূর্ব ঘোষণা মোতাবেক ২০০৬ সালের এই দিনে সারা দেশ থেকে আওয়ামীলীগ ও তার মিত্র দলের নেতা-কর্মী ও তাদের পোষ্য সন্ত্রাসীরা লগি-বৈঠা নিয়ে রাজধানীতে জড়ো হয়। এরপর বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের সমাবেশে হামলা করে। প্রকাশ্য দিবালোকে লগি বৈঠা দিয়ে সাপ মারার মতো পিটিয়ে শিবিরের ৬ নেতাকর্মীকে নৃশংসভাবে হত্যা করে দলটির নেতাকর্মীরা। শুধু তাই নয়, মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর লাশের ওপর নৃত্য করে তারা- যা সভ্য মানুষদের জন্য ছিল অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য। শুধু ঢাকা নয় বরিশালসহ সারা দেশে ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য বাংলাদেশপন্থী দল ও সংগঠনের অফিসে, সমাবেশে ও ব্যক্তিবর্গের উপর হামিলা চালায়। পরবর্তী ১ মাসে আওয়ামী তান্ডবে দেশজুড়ে মারা যায় ৪০ টি প্রাণ। অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে বানচাল করে গণতান্ত্রিক যাত্রা ব্যাহত করে নিজেদেরকে যেকোন উপায়ে ক্ষমতায় আনতে আওয়ামীলীগ বিদেশি শক্তির সাথে মিলে যে ষড়যন্ত্র করেছিল তার প্রারম্ভ হিসেবেই এই লগি-বৈঠা তাণ্ডব চালিয়েছিল তারা। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসলে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় সর্বপ্রথম আক্রমণ চালায় ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধেই।

ঘনঘোর ফ্যাসিবাদের আমলে

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সূক্ষ্ম চুরির মাধ্যমে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামীলীগ। সরকার গঠন করেই চিরকাল নিজেদের ক্ষমতায় রাখার পরিকল্পনা করে তারা। এর অংশ হিসেবে নিজেদের প্রথম ও প্রধান টার্গেট বানায় ছাত্রশিবিরকে৷ প্রতিটি ক্যাম্পাসে হল থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী তো বটেই, সমর্থকদের ও অন্যান্য দল বা মত অনুসারীদেরও করে দেয়। বিভিন্ন সময় শিবির করার "অপরাধে" বা "সন্দেহে", এমনকী স্রেফ ছাত্র শিবিরের কারো সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত থাকায় বা শিবিরের কারো ফেসবুক পোস্টে রিএক্ট করায় অসংখ্য শিক্ষার্থীর উপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। অনেকের ছাত্রত্ব করা হয় বাতিল। ছাত্র শিবির করলেই মিথ্যা মামলা দেওয়া, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা, রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালানো এবং বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটকে রাখা ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক নেতাকর্মী হয় রাষ্ট্র কর্তৃক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রাণান্তকর লড়াই ও ছাত্র জনতার বিপ্লব

আওয়ামীলীগের এই ১৫ বছরের ফ্যাসিজমকে ছাত্রশিবির মুখ বুঝে মেনে নেয়নি। বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে এবং দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে ছাত্রশিবির ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত লড়ে যায়। ফ্যাসিস্ট সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন, গণবিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সক্রিয় প্রতিবাদ জারি রেখেছিল ছাত্রশিবির। বিশেষত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে, বিরোধী রাজনৈতিকদের বিচারিক হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে, ২০১৩ ও ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে, ২০১৪-১৫ ও ২০২২-২৪ সালে শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবীতে আন্দোলনে, ২০১৫ সালের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবীতে আন্দোলনে, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের দুই দফা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র জনতার গণ অভ্যুত্থানে ছাত্রশিবিরের সকল স্তরের জনশক্তিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং আন্দোলন সফলে রাখে সক্রিয় ভূমিকা।

আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছাত্রশিবির

আন্তর্জাতিক সভা, সম্মেলন, সেমিনারে অন্যতম বৃহৎ ইসলামী ছাত্রসংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবিরের ভূমিকা বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মুসলিম বিশ্বের সঙ্কট নিরসনে আন্তর্জাতিক সভা-সমাবেশে শিবিরের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। IIFSO, AFMY, IYFO সহ আন্তর্জাতিক সংগঠনসমূহে ছাত্রশিবিরের প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে যে ছাত্রশিবির বিশ্ব দরবারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ছাত্রসংগঠন। তুরস্ক, ইরান, মালয়েশিয়া, জর্ডান, সৌদি আরব, সুদানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সম্মেলনসমূহে ইসলামী ছাত্রশিবির নিয়মিত অংশগ্রহণ করে থাকে। আবার প্রতি বছর ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ অংশ নিয়ে থাকে। উল্লেখ্য মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমও গত শতাব্দিতে ছাত্রশিবিরের একটি সম্মেলনে উপস্থিত ছিল। ফিলিস্তিন ইস্যুতে আয়োজিত ১৯৯১-এর তেহরান কনফারেন্স-এ শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি যোগদান করেন।

১৯৭৯ সালে রাশিয়া তার পুতুল সরকার বারবাক কারমালের সহযোগিতায় স্বাধীনচেতা আফগানের মানুষের স্বাধিকার কেড়ে নিয়ে সেখানে নগ্ন হামলা চালালে ছাত্রশিবির ঢাকায় ২০ হাজার তরুণের বিশাল মিছিল করে তার প্রতিবাদ জানায়। অধিকৃত কাশ্মিরের স্বাধীনতাকামী মুসলমানদের ওপর নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে শিবির ১৯৮৯ সাল থেকেই কর্মসূচি পালন করে আসছে। বসনিয়া হার্জেগোভিনায় মুসলিম জনপদের ওপর পরিচালিত হত্যাযজ্ঞ ও দমন নীতির প্রতিবাদে শিবির আয়োজন করেছিল র‌্যালি, সমাবেশ ও প্রতিবাদ সভা। সার্ব শাসক ও সেনাগোষ্ঠীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি ছিলো এসব কর্মসূচির লক্ষ্য। ১৯৯১ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণের ব্যাপারে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম প্রতিবাদকারী ছাত্রসংগঠন ছিলো বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। পরবর্তীতে আফগানিস্তান ও ইরাকে বৃহৎশক্তির নির্লজ্জ হামলা, সাধারণ মানুষকে হত্যা করা, শিশুদের নির্বিচারে খুন করার প্রতিবাদে শিবির ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করে। জনমত তৈরি, মিছিল, সমাবেশ, পোস্টারিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ারে কাপুরুষোচিত হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে সেখানকার নিহতদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে। ভারতের অযোধ্যায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে (১৯৯১) উগ্রবাদী হিন্দুরা সে স্থানে রামমন্দির নির্মাণের অন্যায় আবদার করলে ছাত্রশিবির তার তীব্র প্রতিবাদ জানায় ও ব্যাপক জনমত তৈরিতে ভূমিকা রাখে। একইভাবে আহমেদাবাদে দাঙ্গা সৃষ্টি ও নির্বিচারে মুসলিম নিধনের প্রতিবাদ করে শিবির। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর সে দেশের সেনাবাহিনী ও সহিংস বৌদ্ধদের নির্মম নির্যাতনের বিরুদ্ধেও ছাত্রশিবির প্রতিবাদমুখর। ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ ও প্রচারের প্রতিবাদে রাজপথে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। ভারতে ২৬টি আয়াত বাতিলের রিটের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ইসলামপ্রিয় জনতার বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয় শিবির। এভাবেই শিবির প্রতিটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশের সচেতন তরুণদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।