বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গণমানুষের আত্মত্যাগ, প্রতিরোধ ও সংগ্রাম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জুলাই বিপ্লব, এদেশের মানুষের মুক্তির পরম্পরা। চব্বিশের জুলাই আন্দোলন সেই ধারাবাহিকতায় একটি নতুন যুগের সূচনা, যেখানে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার শপথ নেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ ষোল বছরের বাকশালী দুঃশাসন, কর্তৃত্ববাদী নীতি ও রাষ্ট্রীয় জুলুমের বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সর্বাত্মক জনবিদ্রোহ, যেখানে দেশজুড়ে নিপীড়িত মানুষেরা একত্রিত হয়েছিল শোষণের শৃঙ্খল ভাঙতে।
শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, শহর থেকে গ্রাম—বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় প্রতিরোধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। দুঃশাসনের নিপীড়ন থেকে কেউ রেহাই পায়নি—শ্রমিক, দিনমজুর, ছাত্র, শিক্ষক, সাংবাদিক, রেমিট্যান্স যোদ্ধা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—সকলেই তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাস্তায় নেমেছিল। বিশেষত তরুণ প্রজন্ম ছিল এই বিপ্লবের অগ্রদূত, যারা নিজেদের রক্ত ঢেলে স্বাধীনতার অর্থ নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছিল।
এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল সাহসী শহীদের আত্মত্যাগ। শহীদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ, তাদের বিসর্জনের উপর দাঁড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে গিয়েছিল। ছাত্রনেতাদের সাহসী নেতৃত্ব, শ্রমিকের ঘাম, মায়ের দোয়া, প্রবাসীর কান্না—সব মিলিয়ে এই বিপ্লব পরিণত হয়েছিল এক সর্বজনীন গণজাগরণে। এই আন্দোলন শহীদ আবু সাঈদের অমর আত্মদানের, শহীদ মীর মুগ্ধের অবিনশ্বর প্রতিরোধের প্রতীক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু হয়ে আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, রাজপথে, গ্রামে ও পল্লীতে। শোষিত মানুষদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এক ভয়ংকর বিস্ফোরণে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি মানুষের মুখে ছিল একটাই প্রশ্ন—‘আমার ভাই মরলো কেন?’ আর এই প্রশ্নের উত্তর আদায়ের সংকল্পই পরিণত হয়েছিল ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে এক অবিচল প্রতিরোধে। যেই ফ্যাসিবাদ দীর্ঘকাল ধরে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাবহার করে জাতির উপর চালিয়ে ছিলো বিভাজন ও নিষ্পেষনের রাজনীতি, সেই রাজনীতিই বুমেরাং হয়ে তাদের মসনদ খানখান করে দেয়। ফ্যাসিস্ট হাসিনার রাজাকার বানানোর নীতি এবার তাকেই উতখাত করে দেয়।
জুলাই ছিল সেই বিপ্লব, যেখানে রাজনীতির বিভেদ ভুলে, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল। একদিকে তরুণ প্রজন্মের আবেগ ও দৃঢ়তা, অন্যদিকে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে এই আন্দোলন হয়ে উঠেছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণজাগরণ।
বিপ্লবের দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নও তার ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছিল—বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন তরুণেরা, জেলে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, অথচ কারও মনোবল ভাঙেনি। বরং শহীদের রক্ত আরও বেশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
এই আন্দোলন ছিল শুধুমাত্র রাজনৈতিক লড়াই নয়, এটি ছিল একটি সামাজিক পরিবর্তনেরও সূচনা। শ্রমজীবী মানুষ, নিম্নবিত্ত শ্রেণি এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও এই বিপ্লবের অংশ হয়ে ওঠে। নারীরা সামনের সারিতে থেকে লড়াই করেছে, প্রবীণরা ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন নতুন প্রজন্মকে।
শহীদদের আত্মত্যাগের বদৌলতে এই আন্দোলন ক্রমশ একটি বৃহত্তর গণজাগরণে পরিণত হয়। গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে সমতল, মসজিদ থেকে মন্দির—সর্বত্র একটাই সুর ধ্বনিত হয়েছিল, ‘বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চায়’।
শহীদদের আত্মাহুতির ফলে সরকার পতনের সূচনা হয়, স্বৈরাচারের দেয়াল ভেঙে যায়। জনগণের চাপে অবশেষে প্রশাসনকে নতি স্বীকার করতে হয়। ৩৬শে জুলাই এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে, গণতন্ত্র ফিরে আসে। ফতহে গণভবন হয় এক ঐতিহাসিক সত্য, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পুনরায় জনগণের হাতে আসে।
জুলাই বিপ্লবে ছাত্রশিবিরের অবদান
ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ইসলামী ছাত্রশিবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কোটা সংস্কারের দাবিতে গঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু থেকেই শিবিরের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে শক্তিশালী ভিত্তি লাভ করে। আন্দোলনের শুরুর দিকে বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংগঠনিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে ছাত্রশিবির। আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদসহ বিভিন্ন ছাত্রনেতা ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি সাদিক কায়েমের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। আন্দোলনকে বেগবান করতে শিবিরের কেন্দ্রীয় কমিটি তাদের সম্পূর্ণ সমর্থন ও সাংগঠনিক শক্তি বিনিয়োগ করে।
আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে ছাত্রশিবিরের জনশক্তির ব্যাপক উপস্থিতি আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন শাখা সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নেয় এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
১৫ জুলাই ছাত্রলীগের হামলার পর, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শিবিরের কর্মীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন হাসপাতালে উপস্থিত হয়। আহতদের পাশে দাঁড়িয়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করে। সেই রাতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শিবিরের বিভিন্ন শাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবিলাইজ করে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে শহীদ মিনারে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি করতে শিবিরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের ডিবি হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার যে শুন্যস্থান তৈরী হয়, ছাত্রশিবিরের সহায়তায় দ্বিতীয় সারির নেতাদের মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আব্দুল কাদের, আব্দুল হান্নান মাসুদ, রিফাত রশিদসহ কয়েকজন নেতাকে ডিবির হাত থেকে বাঁচাতে শিবির সরাসরি সেইফ হোমের ব্যাবস্থা করে। দ্বিতীয় সারির নেতাদের ঘোষণা মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে।
এমনই এক আন্দোলনের ক্রান্তিলগ্নে ছাত্রশিবির নয় দফা তৈরী করে। আন্দোলনকে কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে রূপ দিতে ৯টি কৌশলী দাবি প্রণয়ন করা হয়, যাতে সরকারের পক্ষে এগুলো মেনে নেওয়া অসম্ভব হয় বা মানলেও ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে পড়ে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের সরাসরি দাবি না তুলে তাকে জাতির সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করার কৌশল নেওয়া হয়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাস বন্ধে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলা হয়, যা পরে আন্দোলনের ধারাকে এক দফার দিকে এগিয়ে নেয়। এই কৌশলগত পরিকল্পনার মাধ্যমেই আন্দোলন ফ্যাসিবাদের পতন নিশ্চিত করে এবং ছাত্র রাজনীতির প্যারাডাইম শিফটের পথ সুগম হয়। ৯ দফা প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম এবং ঢাবি শিবিরের সাবেক সভাপতি মীর্জা গালিব, শরফুদ্দিন, আলী আহসান জুনায়েদ, সিবগাতুল্লাহ ও রাফে সালমান রিফাত।
আন্দোলন দমনে সরকার যখন শহীদদের সংখ্যা ও হতাহতের পরিসংখ্যান লুকানোর চেষ্টা করে, তখন ছাত্রশিবির নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রস্তুত করে এবং আন্তর্জাতিক মহলে এই তথ্য ছড়িয়ে দেয়। শিবিরের সহযোগিতায় ‘স্টুডেন্ট এগেইনস্ট অপপ্রেশন (SAO)’ আন্দোলনের গণহত্যার তথ্য সংকলন করে এবং শহীদদের তালিকা প্রকাশ করে, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়।
৩০ জুলাই ‘মুখে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে ছবি তুলে অনলাইনে প্রচার’ কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করে শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, যা সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলে। ৩১ জুলাই ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে শিবিরের কর্মীরা শিক্ষক, আইনজীবী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলনের নতুন মাত্রা যোগ করে।
৩২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির নিষিদ্ধের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পরে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নির্ধারণে করে শিবির। এদিন ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচির আওতায় শহীদ ও আহতদের স্মরণে স্মৃতিচারণ, গল্প লেখা, চিত্রাঙ্কন ও গ্রাফিতি আঁকা হয়, পাশাপাশি পরিবার ও সহপাঠীদের মধ্যে তাদের স্মৃতি তুলে ধরা হয়। ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ ও ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’ কর্মসূচি প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন জাহিদুল ইসলাম ও আলী আহসান জুনায়েদ।
৩৫শে জুলাই ৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। শিবিরের পরামর্শে একদিন এগিয়ে আনা হয়, এরপর আসিফ মাহমুদ ঘোষণা দেন, ‘পরশু নয়, আগামীকালই লং মার্চ টু ঢাকা।’