অপার সম্ভাবনার দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই ভঙ্গুর ও পশ্চাৎপদ অবস্থার অন্যতম বড় হেতু হচ্ছে দুর্নীতি। বিশ্বের ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশসমূহের মধ্যে বাংলাদেশকে গণ্য করা হয়। টিআইবি-এর পরিসংখ্যান মতে, ২০২৩ এবং ২০২৪ বাংলাদেশ সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে যথাক্রমে ১০ম এবং ১৪তম স্থান দখল করেছে। এর আগেও পূর্ববর্তী আওয়ামীলীগ সরকারের দুর্নীতির ধারাবাহিকতায় ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ টানা ৫ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়।
বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে দুর্নীতির এহেন বিস্তারের জন্য দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, আইনের শাসন না থাকা, সরকারী খাতে স্বল্প বেতনসহ বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতাকে মূলত দায়ী করা হলেও, সমস্যার মূল আরো গভীরে। বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গী মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল থেকে উত্তরাধিকার সূত্র থেকে পাওয়া। ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের উপনিবেশগুলোতে একরকমের শোষণমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের উপনিবেশগুলো একসময় ছেড়ে চলে গেলেও জনগণ থেকে যতটা পারা যায় শোষণ করে লাভবান হওয়ার ঔপনিবেশিক প্রবণতা নবগঠিত রাষ্ট্রের মন্ত্রী এবং আমলাদের মধ্যে রয়ে যায়। পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে সরকারি প্রশাসনিক দুর্নীতির পিছনে এই কারণটি বহুলাংশে দায়ী। তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখায় দুর্নীতিতে বাংলাদেশ অতীতের সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলে। ক্ষমতার উপর নিয়ন্ত্রণ পাকাপোক্ত করার জন্য আওয়ামী সরকার প্রশাসনিক পদসমূহে নির্বিচারে দলীয় লোকদের নিয়োগ দেয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকায় জবাবদিহিতারও কোন বালাই ছিল না। ফলে ১৫ বছর অবাধে দুর্নীতি চলতে থাকে। প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে উঠে আসে, আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ২৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; লুটপাট করা হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর ৪০ শতাংশ অর্থ।
কিন্তু একটি দেশ ও জাতির মধ্যে দুর্নীতি কেবল কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার মাধ্যমে রোধ করা যেতে পারে না। দুর্নীতির পিছনের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এর পিছনে মূলত কাজ করে অর্থলোভ যা মেটানোর জন্য দুর্নীতিকারী দায়িত্বের আমানত খিয়ানত করে অর্থ আত্মসাৎ অথবা অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহের কাজে লিপ্ত হয়। এই কাজ করার সাহস দুর্নীতিকারী তখনই পায় যখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি থাকে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়। এছাড়াও আশেপাশে সর্বত্র দুর্নীতির চলন দেখলে চারিত্রিক দৃঢ়তাবিহীন যেকেউ নিজেও দুর্নীতি করতে উৎসাহিত হয়। যে পরিবেশে অনৈতিকতা প্রাধান্য লাভ করে সেখানে ব্যক্তিও অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকতে পারে না। মানুষের স্বভাবতই তার পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এককথায়, ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক নৈতিকতার অধঃপতন, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি - এসবই দুর্নীতির জন্য দায়ী।
বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে কেবল আইনের কঠোর শাসন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়। কোন জাতিকে ইতিবাচক অভিমুখে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করার জন্য প্রথমে ব্যক্তি ও সমাজ পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টিনিবদ্ধ করা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজন সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারণ। আল্লাহ ও তাঁর কাছে জবাবদিহিতার বিশ্বাস না থাকলে নৈতিকতা কোন নৈর্ব্যক্তিক শিকড় পায় না। ৯০% মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশে সমাজে ব্যাপকভাবে ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার ছাড়া সততা ও আমানতদারিতার মূল্যবোধ অর্থবহভাবে তৈরী হতে পারে না, যা দুর্নীতি দূর করার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ইসলাম যে ব্যাপক ও সামগ্রিক সামষ্টিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেয় তার প্রচার-প্রসারের ফলে সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী হবে এবং তা মানুষকে সামষ্টিক কল্যাণের চিন্তার দিকে ধাবিত করবে। এরপরই আসে দুর্নীতি রোধে যে রাষ্ট্রীয় আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মকানুনসমূহ আছে সেগুলোকে কার্যকর করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এগুলো কার্যকর না হওয়ার মূলে রয়েছে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলদের সদিচ্ছার অভাব, যাদের অধিকাংশ নিজেরাই দুর্নীতিতে জড়িত কিংবা দুর্নীতিগ্রস্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চাপে নিয়মকানুন ও আইন কার্যকর করেন না। সমাজে সততা ও আমানতদারীতার মূল্যবোধ কায়েম হলে তা রাষ্ট্রেও সঞ্চারিত হবে। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ তো সমাজ থেকেই উঠে আসেন। এছাড়াও জনগণ তাদের নির্বাচিত সংসদ সভাসদদের প্রকৃত অর্থে নিজেদের প্রতিনিধি ভাবা শুরু করলে তাদের জবাবদিহিতা নিতেও সচেষ্ট থাকবে। আর রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও নিজেদের জনগণের আমানতদার ভাবা শুরু করবেন। সুকৃতির জন্য সহায়ক এ ধরনের পরিবেশে আইনকানুন মূলত সকল ধরনের দুর্নীতির প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে। অল্পসংখ্যক যারাই দুর্নীতি করতে উদ্দত হবে তাদের বিরুদ্ধেই কঠোরভাবে রাষ্ট্রের নিয়মকানুন ও আইন প্রয়োগ হবে।
মানুষ অর্থ বা ধনসম্পদের লোভের জন্য করলেও ধনসম্পদ সহজাতভাবেই খারাপ কিছু নয়। আল্লাহ কোরআনে বলেন:
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ
অর্থ: “আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ কর। আর যমীনে ফাসাদ করতে চেয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ ফাসাদকারীদের ভালবাসেন না’।” [সূরা ক্বাসাস: ৭৭]
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট যে, মানুষ দুনিয়ার ধন-সম্পদ থেকে বিমুখ থাকুক আল্লাহ এমনটা চান না। বরং তিনি চান মানুষ এই ধন-সম্পদ বৈধপথে আয় করুক, দুর্নীতি ও অন্যান্য অবৈধ পথে নয়; সেইসাথে এই অর্জিত ধনসম্পদকে কেবল আত্মকেন্দ্রিকভাবে ব্যবহার না করে মানুষ বৃহত্তর সমাজ ও মানবতার জন্য ব্যয় করার মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করুক। ধনসম্পদ অর্জন করতে গিয়ে যেন মানুষ অন্যের ক্ষতি না করে এবং পৃথিবীতে বিকৃতি ও দুর্নীতি সৃষ্টি না করে এটাই খোদায়ী আদেশ।
এই আয়াতকে ব্যক্তি ও সামষ্টিক চেতনায় ধারণায় করে মানুষের নৈতিকতা ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতিকে বিতাড়িত করা সম্ভব।