মেধাপাচার বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য একটি গভীর সমস্যা। বেশি বেতনের কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য উন্নত সুযোগ সুবিধার খোঁজে অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে মেধাবী ও দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তি উন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হয়ে থাকে। মেধাপাচারের ফলে তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ মূল্যবান মানবসম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে উন্নয়ন ও উৎপাদনের হার কমে যাচ্ছে এবং তদঞ্চল থেকে উঠে আসা মানবসম্পদ উন্নত দেশগুলোতে স্থানান্তরিত হওয়ায় বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল-স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মেধাপাচারের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং দুর্নীতি। এর ফলে এসব দেশসমূহ তাদের উচ্চশিক্ষিত জনশক্তির জন্য উচ্চতর গবেষণা ও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা সরবরাহ করতে সক্ষম হয় না।
মেধাপাচারের পিছনে বাংলাদেশের মত স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ভঙ্গুর কাঠামো যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সেক্যুলার পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার অধীন যে শিক্ষাপদ্ধতি তা উপযোগিতাবাদী হওয়ার কারণে নিরঙ্কুশ ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে কেবলই আত্মকেন্দ্রিকতার জন্ম দেয়। এই শিক্ষাব্যবস্থায় যতই দেশপ্রেমের শিক্ষা দেয়া হোক না কেন, শিক্ষাব্যবস্থার খোদাহীন, সেক্যুলার ও পার্থিবতাসর্বস্ব শিকড়ের কারণে তা কেবল ফাঁপা বুলিতে পর্যবসিত হয়। এর প্রমাণ হচ্ছে রাষ্ট্রের শিখরে বসে থাকা দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ ও আমলারা, যারা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মানদন্ডে যথেষ্ট উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাদের উচ্চশিক্ষা তাদের দুর্নীতি থেকে দূরে রাখতে পারেনি। উল্টো দুর্নীতিই রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে সাধারণ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
তাই মেধাপাচার দূর করতে হলে প্রথমে এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিক্ষাদানের পাশাপাশি সত্যিকারের নৈতিক শিক্ষাপ্রদান ও চর্চার মাধ্যমে নৈতিকতাকে শিক্ষার্থীদের অন্তরে গেঁথে দিতে হবে। একটি মুসলিম রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশের এই নৈতিকতার ভিত্তি স্বভাবতই হতে হবে ইসলাম। সেই সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগণকে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুযায়ী নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপীয় দেশসমূহসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর আরামদায়ক জীবন ছেড়ে দেশে বিদ্যমান স্বল্প সুযোগের বিনিময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ অন্যান্য ময়দানে কাজ করার জন্য যে পরার্থপরতা, সভ্যতাগত দর্শন এবং তদ্ভূত আত্মোৎসর্গের চেতনা প্রয়োজন বাংলাদেশের মত মুসলিম রাষ্ট্রে তা তাক্বওয়া এবং ইহসানভিত্তিক নৈতিক ও আদর্শিক প্রেরণা ছাড়া সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। একইসাথে প্রবাসফেরত উচ্চদক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদের দক্ষতাকে সূচারুরূপে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সুদক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত ও ভিশনারী রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রকে একই সাথে হতে হবে ইনসাফপূর্ণ এবং সুকৃতির প্রতিষ্ঠাকারী ও দুষ্কৃতির রোধকারী।
একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামকে সভ্যতাগত মূল হিসেবে ধরে নিয়ে দিক দিয়ে বাংলাদেশকে অগ্রগামী ও বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ আসনে আসীন করার ভিশন শিক্ষার্থীদের অন্তরে বপন করতে হবে। একইসাথে সমসাময়িক জ্ঞান-বিজ্ঞানে গবেষণার ক্ষেত্র প্রসারিত করার জন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও গবেষণা অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে, যাতে উচ্চশিক্ষায় গবেষণারত শিক্ষার্থীরা দেশেই গবেষণা করার মত উৎসাহ পায়। যেসব শিক্ষার্থীরা বিদেশে উন্নত মানের উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য গমন করে তাদের দেশে ফিরে আসতে উৎসাহিত করার জন্য নতুন নতুন গবেষণা, শিক্ষা ও চাকরিসংক্রান্ত খাতগুলোতে বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে।