This website is under construction
নারী অবমাননা রুখো
Campaigns
Stop Women Harrasment

মানব সভ্যতা বিনির্মাণে নারী হচ্ছে পুরুষের সহযাত্রী। নারী-পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। নারী হচ্ছে মা, জায়া, ভগিনী। সমাজে নারীর মর্যাদা ও যথাযথ ভূমিকা পালনের উপরই নির্ভর করে সমাজের স্থিতিশীলতা। আধুনিকতা সমাজে এনেছে গতি, ঘটিয়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। এখন নারীরা ঘরের পাশাপাশি ঘরের বাইরেও ভূমিকা রাখছে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের নামে নারী স্বাধীনতার কথাও অনেক বলা হচ্ছে। কিন্তু নারী কি আগের চেয়ে বেশি সুরক্ষিত হয়েছে? এর উত্তর হচ্ছে না। ২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) দ্বারা প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশের ৭৫.৯% নারী জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে ২৯% নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত এক বছরই যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে দেশের ৯.৪% নারী।   

নারীর এই নিগ্রহের মূল কারণ নিহিত রয়েছে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ অবক্ষয়ের মধ্যে। নারী ততক্ষণ শক্তিশালী যতক্ষণ সামাজিক ব্যবস্থা শক্তিশালী। আর সামাজিক ব্যবস্থা ততক্ষণ শক্তিশালী যতক্ষণ নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ শক্তিমত্তার সাথে কায়েম থাকে। ঐতিহ্যবাদী এই মূল্যবোধ নারীকে তার স্বতন্ত্র্য ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সমাজে মর্যাদার আসনে আসীন করে। যখন এই মূল্যবোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যায় তখন সমাজে জোরজবরদস্তিমূলক জুলুমতন্ত্র শুরু হয়। নারীদের মর্যাদা সম্পর্কে অনেকক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা হারিয়ে ভোগ্যপণ্য কিংবা ঊনমানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে।

ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন, যৌতুক, পারিবারিক সহিংসতা, নারী পাচারসহ বিভিন্ন নারী নির্যাতনের মাধ্যমে মূল্যবোধের এই অবক্ষয় মূর্ত হয়ে উঠে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। নারী স্বাধীনতার নামে নারীকে নৈর্ব্যক্তিকীকরণের (objectification) মাধ্যমে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করার পিছনে মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক, বিশেষ করে বিনোদন শিল্পের বড় ভূমিকা রয়েছে। শিল্প ও শৈলীর নামে নারীকে অশ্লীল ও যৌন আবেদনময়ী পোশাক ও অঙ্গভঙ্গিতে নাটক ও সিনেমায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। নাটক ও সিনেমায় নারী হেনস্থা ও শ্লীলতাহানি এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সমাজের নীচ চরিত্রের পুরুষরা নারীকে বাজে দৃষ্টিতে দেখতে, উত্যক্ত কিংবা আরো আগ বাড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতনে উৎসাহিত হচ্ছে। 

ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক দ্বারা নারী নির্যাতন, হেনস্থা ও যৌন হয়রানির ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাস বিনির্মাণে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সচেতনতা ও কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

আইনের যথাযত প্রয়োগই নারী নির্যাতন রোধের একমাত্র উপায় হতে পারে না। যে নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ ব্যবস্থা সমাজে নারীকে সম্মানিত করেছে তা ফিরিয়ে আনতে হবে। নারীর প্রতি যৌন নির্যাতনের সূচনা নারীর প্রতি লালসাপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে। এটাকে একদম গোড়াতেই বন্ধ করে দিতে ইসলাম পুরুষকে নারীর প্রতি দৃষ্টি সংযত করতে বলেছে। কোরআনে এরশাদ হচ্ছে:

قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ یَغُضُّوۡا مِنۡ اَبۡصَارِهِمۡ وَ یَحۡفَظُوۡا فُرُوۡجَهُمۡ ؕ ذٰلِكَ اَزۡكٰی لَهُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ خَبِیۡرٌۢ بِمَا یَصۡنَعُوۡنَ

“মুমিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত।” [সূরা নূর-৩০]

অনেক সময় নারীর (এবং পুরুষেরও) পোশাকের অশালীনতা এবং অঙ্গভঙ্গীকে বিনোদন জগত, সংস্কৃতি ও আর্টের নামে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে নারীর স্বাধীনতা রক্ষিত হয় না, বরং নারীকে পুরুষদের লালসার লক্ষ্যবস্তু হিসেবেই জনসম্মুখে হাজির করা হয়। বিনোদন ও সংস্কৃতির নামে এসব বেহায়াপনা এবং নারীর অবমূল্যায়ন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। নারী নিয়ে অশ্লীল কৌতুক ও চটকদার আলোচনা বন্ধ করতে মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা সমাজে ফিরিয়ে আনতে হবে।

এক সাহাবী একবার অকপটভাবে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট যিনা করার অনুমতি চাইলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে না বকা দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি (সাহাবী) কি তাঁর মা, কন্যা, বোন, ফুফু বা খালার সাথে কেউ যিনা করুক তা পছন্দ করবেন কিনা। সাহাবী বললেন, কখনোই না। জবাবে রাসূলুল্লাহ বললেন: মানুষও তার মা, কন্যা, বোন, ফুফু বা খালাদের সাথে যিনা হোক তা পছন্দ করবে না (মুসনাদে আহমাদ, আবু উমাম থেকে বর্ণিত)।

বাংলাদেশে বেশিরভাগ পারিবারিক সহিংসতাই বিশেষে করে যৌতুকের দাবীতে স্বামী কর্তৃক স্ত্রী নির্যাতন হয়ে থাকে। সমাজ থেকে যৌতুকের মত অভিশপ্ত প্রথা দূর করতে হলে ইসলামের মোহরানা প্রথা এবং স্ত্রীর অর্থনৈতিক দায়িত্ব যে পুরুষের, সে সম্পর্কে সচেতনতা তৈরী করতে হবে। এটা একটা বাস্তবতা যে, নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা নারীকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে নি। পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় কারণ সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে যাওয়া। নারীর পিতা, ভাই, চাচাসহ অন্যান্য নিকটাত্মীয় পুরুষদের একটি বড় ভূমিকা থাকার কথা ছিল পারিবারিক সহিংসতার হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের নামে আত্মকেন্দ্রিক প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ার কারণে ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও আত্মীয়গত দায়িত্বের ব্যাপারটি অবহেলিত।

নারী নির্যাতনের যথাযথ প্রতিকার না হওয়ার একটি বড় কারণ বর্তমান বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা। ঔপনিবেশিক বিচারব্যবস্থায় একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। অনেকসময় ঘুষ ও অন্যান্য অসদোপায় অবলম্বন করে দোষীরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে নারী নির্যাতন করে পার পেয়ে যাওয়ার ফলে নারী নির্যাতনের পথে কোন আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধক তৈরী হচ্ছে না। আবার নারী নির্যাতনের প্রচুর মিথ্যা মামলা হওয়ার কারণেও নারী নির্যাতনবিরোধী আইন তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। 

নারী নির্যাতন একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা। আইনীভাবে এই সমস্যা সমাধান করার আগে সামাজিকভাবে এই সমস্যার মোকাবেলা করতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের পুনঃজাগরণ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।