ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামল, পাকিস্তান শাসনামল এবং স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস থাকলেও একটি নেতিবাচক দিক থেকে ছাত্র রাজনীতি কখনো মুক্ত হতে পারে নি আর তা হচ্ছে ক্যাম্পাস সহিংসতা। এই সহিংসতার একটি বড় অংশ বিভিন্ন ছাত্র-সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও সংঘাত। এছাড়াও ক্যাম্পাসে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, নারী নিগ্রহসহ অন্যান্য যেসব সহিংসতা ঘটে থাকে সেটাও ছাত্র-রাজনীতি আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায়ই সাধারণত হয়ে থাকে। একটি রিপোর্টে উঠে আসে যে, ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতি উদ্ভূত ক্যাম্পাস সহিংসতার ফলে নিহত হয়েছে ১৬১ জন এবং আহত হয়েছে ১৬১৮২ জন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান বিতরণ ও উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে বিভিন্ন মত, পথ, আদর্শ, চিন্তা থাকবে, তাদের মধ্যে মতের আদান-প্রদান হবে এবং এ থেকে বের হয়ে আসবে নতুন নতুন চিন্তার খোরাক। কিন্তু এর বদলে বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলো প্রত্যক্ষ করেছে ক্যাম্পাস সহিংসতা, যা ছাত্র রাজনীতির অনেক গৌরবকে ম্লান করে দিয়েছে।
ক্যাম্পাস সহিংসতার মূল নিহিত রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের দলীয়করণে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনগুলোতে নিজেদের লোক বসায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র-সংগঠন ক্ষমতার জোর করে হল দখল করে অন্যান্য ছাত্র-সংগঠনগুলোকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে বিরোধী দলের ছাত্রসংগঠনসমূহও ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের বিরুদ্ধে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, যার একটি প্রভাব দেখা যায় ক্যাম্পাসের হলগুলোর দখল-পাল্টা দখলে। ছাত্রসংগঠনগুলোকে আবার ক্যাম্পাসে নিজ নিজ দলের কর্মসূচী ও রাজনৈতিক অবস্থানের পক্ষে ক্যাম্পাসে সভা-সমাবেশ ও মিছিল ইত্যাদি রাজনৈতিক কর্মসূচী পালন করতে দেখা যায়। অনেকসময় এসব কর্মসূচী বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর হামলার কারণেও হতাহতের ঘটনা ঘটে থাকে।
অনেককেই আবার ক্যাম্পাস সহিংসতার সূত্র ধরে ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবী করতে দেখা যায়। এই দাবীও যৌক্তিক নয়। ছাত্র রাজনীতির কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরী হলেও ছাত্র-রাজনীতির অনেক ইতিবাচক দিকও রয়েছে। এজন্য ছাত্র-রাজনীতিকে একেবারে নিষিদ্ধ করে দেয়ার দাবী অনেকটা মাথাব্যথা সারাতে মাথা কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়ার মত। ছাত্রকালীন সময়টাই মানুষের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের সর্বোত্তম সময়। কর্মজীবনে প্রবেশ এবং বিয়ে করে পরিবার জীবন শুরু না করার কারণে ছাত্রদের মধ্যে তখনো আত্মকেন্দ্রিকতা তৈরী হয় না। পড়াশোনার পাশাপাশি তারা দেশ ও দেশের রাজনীতি নিয়ে চিন্তা ভাবনার সুযোগ থাকে এবং প্রয়োজনে দেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার রাজনীতিতে যোগ দিতে পারে। ছাত্র-রাজনীতি নিষিদ্ধ করে ছাত্রদের এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।
ক্যাম্পাস সহিংসতাসহ ছাত্র-রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো দূর করার জন্য প্রথমে প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ করা, যাতে প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে এবং ক্যাম্পাসে সৃষ্ট যেকোন অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে ক্যাম্পাসের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারে। এরপর যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে ছাত্র-রাজনীতিকে লেজুড়বৃত্তি থেকে বের করে আনা। ক্যাম্পাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্রসংগঠন থাকতে পারে, তবে মূল দলের কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে কোন ধরনের মিছিল-মিটিং এবং সভা-সমাবেশ করতে পারবে না। তবে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর গৃহীত পলসির পক্ষে-বিপক্ষে ছাত্র-সংগঠনগুলো সুস্থ তর্ক-বিতর্ক করতে পারে এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। ক্যাম্পাসে সুস্থ ছাত্র-রাজনীতি নিশ্চিতকরণ এবং সহিংসতা এড়াতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় আরেকটি কার্যকর পদক্ষেপ হচ্ছে ছাত্র-সংসদগুলোকে কার্যকর রাখা এবং তাদেরকে যথাযথভাবে কাজ করতে দেয়া। ছাত্র-সংসদের মাধ্যমেই ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে সহিংসতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি না করে সুস্থ ও গঠনমূলক দিকে ধাবিত করা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আসতে হবে ছাত্রদের মধ্য থেকেই। তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে। আল্লাহ কোরআনে বলেন:
وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
“রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মুর্খরা (উগ্র) কথা বলতে থাকে, তখন তারা শান্তভাবে নম্রতার সাথে জবাব দেয়।” [সূরা ফুরক্বান:৬৩]
ক্যাম্পাস সহিংসতার পিছনে দিনশেষে ছাত্রদের উগ্রতা ও ঔদ্ধত্য আচরণ দায়ী। এই আয়াতে আল্লাহ আমাদের কেবল বিনয়ী আচরণ করতে বলছেন না, মূর্খতাপূর্ণ রূঢ় আচরণের জবাবে শান্ত ও সৌম্য আচরণের নির্দেশ দিচ্ছেন। এই আয়াতের শিক্ষার বাস্তবায়নের মাধ্যমে কেবল সহিংসতার উদ্যোগ বা সূচনা বন্ধ হবে না, সহিংসতার বদলে পাল্টা-সহিংসতা তথা সহিংসতার দুষ্ট চক্র বন্ধ হতে পারে।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশকে শিক্ষা, জ্ঞান, গবেষণা ও চিন্তার ময়দানে সমুচ্চ অবস্থানে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্যাম্পাস সহিংসতার অতীত ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেজন্য প্রয়োজন ছাত্র-রাজনীতিকে নতুন ইতিবাচক ও গঠনমূলক দিকে চালিত করতে হবে।