নেতৃত্ব হচ্ছে কোন অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে অন্যদের পথ দেখানো। নেতৃত্ব মানে কেবল কর্তৃত্ব ফলানো নয়, দিকনির্দেশ করা এবং অন্যদের তা অনুসরণ করতে অনুপ্রাণিত করাও নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত। ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা চালাতে হয়। আর যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সমষ্টির সাথে সম্পৃক্ত তা অর্জনের লক্ষ্যে সামষ্টিক প্রচেষ্টা চালাতে হয়। আর যেকোন সামষ্টিক প্রচেষ্টাকে সুপরিচালিত করার জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব।
বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ পিছিয়ে থাকার একটি বড় কারণ হচ্ছে সামাজিক নেতৃত্বের সংকট। এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য যে, এক্ষেত্রে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে তফাৎ রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব অনেকসময় সামাজিক মূল্যবোধের তোয়াক্কা না করেই রাজনৈতিক পেশিশক্তির আশ্রয়ে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে আসীন হতে পারে। মূলত তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোতে এমনটাই দেখা যায়। সমাজের সাধারণ মানুষ হয়তোবা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে বা দুর্বলতার কারণে বেশিরভাগ সময়ই তাদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকে কিন্তু এ ধরনের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বকে তারা কখনো আদর্শ নেতৃত্ব মনে করে না।
অন্যদিকে সামাজিক নেতৃত্ব সমাজের মানুষের মূল্যবোধ এবং আশা-আকাঙ্খাকে ধারণ করেই উঠে আসে। সামাজিক নেতৃত্ব যখন রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসে তখনই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জনগণের আশা-আকাঙ্খাকে ধারণ এবং দেশকে দুর্নীতি ও অদক্ষতার শৃঙ্খল ভেঙ্গে প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়া সম্ভব হয়ে উঠে।
সৎ ও ইনসাফপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন নিঃসন্দেহে সর্বযুগে একটি মহান উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ন্যায়বিচারকারী ও কল্যাণময় রাষ্ট্র ব্যতীত পৃথিবীতে সুকীর্তির প্রসার এবং কুকীর্তির অপসারণ করা সম্ভব নয়। সৎ, আল্লাহভীরু এবং দক্ষ নেতৃত্ব ছাড়া এই ধরনের সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা সম্ভব নয়।
كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِٱلْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ ٱلْمُنكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِٱللَّهِ
“তোমরাই হলে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, যাদের মানবজাতির কল্যাণের জন্য উত্থিত করা হয়েছে। তোমরা কল্যাণের আদেশ দাও এবং অসৎকাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর উপর ঈমান রাখো।” [সূরা আলে ইমরান: ১১০]
নেতৃত্ব এমন একটি আকাঙ্খিত গুণ, যা সকলের মধ্যে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সৎ নেতৃত্বের গঠনের জন্য প্রয়োজন পরিবেশ ও চর্চা। একটি মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী জীবনদর্শন, আমানতদারীতা, দায়িত্বশীলতা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক সহানুভূতিশীলতাসহ বিভিন্ন মূল্যবোধ এবং মানুষের সেবা করার মানসিকতা ছোট থেকেই সমাজের সদস্যদের অন্তরে প্রোত্থিত করে দেয়া প্রয়োজন, যাতে একটি শক্তিশালী সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলা যায়। এছাড়াও কিশোর বয়স থেকেই বিভিন্ন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলীর বিকাশ করার ব্যবস্থা করতে হবে।
নেতৃত্বের ক্ষেত্রে কেবল নৈতিক উৎকর্ষতাকেই বিবেচনায় রাখলে চলবে না, অন্যান্য পার্থিব যোগ্যতা বিশেষ করে বিবেচ্য ক্ষেত্রে যে দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োজন সেটাকেও সামনে রাখতে হবে। নেতৃত্বের ইসলামী দর্শন এটাই বলে যে, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বে কল্যাণের প্রসারণ এবং দুষ্কৃতির প্রতিরোধ করার জন্য সমাজ, রাষ্ট্র ও সমসাময়িক বিশ্ব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং এই জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে বাস্তবায়ন করার জন্য যথাযথ দক্ষতা প্রয়োজন।
আল্লাহভীরুতা যেখানে সৎ থাকার অনুপ্রেরণা যোগায়, সেখানে পার্থিব যোগ্যতা নীতিভ্রষ্ট অসৎ ব্যবস্থা ও শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে লড়াই করার সামর্থ্য সরবরাহ করে। তাই তাক্বওয়া ও সততা ও আমানতদারিতার ভিত্তিতে নতুন সমাজ বিনির্মাণের জন্য অবশ্যই সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব তৈরির কাজ করে যেতে হবে।