ভারতের বর্ণহিন্দুদের সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসনের যাঁতাকল থেকে মুক্ত হয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনপূর্ব ভারতের মুসলিম শাসনের লিগ্যাসি হিসেবে পাকিস্তান গঠিত হয়, যেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের মুসলিমরা তাদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারবে। হাজারো-লক্ষ মুসলমানের প্রাণ ও হিজরতের বিনিময়ে অর্জিত পাকিস্তানকে সেসময় একটি নতুন মদীনার রূপকল্প হিসেবে দেখা হয়েছিল। মদীনা কিংবা এর পরবর্তী সম্প্রসারণ হিসেবে খিলাফতে রাশেদা যেমন ছিল বর্ণ, গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে একটি সার্বজনীন শাসনব্যবস্থা, তেমনি পাকিস্তানেও ছিল বিভিন্ন ভাষাভাষী, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ। বাঙ্গালী, পাঞ্জাবী, সিন্ধী, বেলুচ, পশতুনসহ বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আন্দোলনের সময় ভাবী পাকিস্তানকে ওসমানী খিলাফতের পতনের পর আধুনিক যুগে ইসলামের নতুন আলোক মিনার হিসেবে কল্পনা করা হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের স্লোগান ‘পাকিস্তান কা মাতলাব ক্যায়া, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ স্লোগানেও এই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটে। তাই নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানের নেতৃত্বের কাঁধে এক গুরুভার ছিল এই রূপকল্প বাস্তবায়ন করার। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি তারা এই গুরুভার বোঝেন নি কিংবা তা বহনে অক্ষম ছিলেন, যার ফলস্বরূপ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বছরের মাথায় পাকিস্তান ভেঙ্গে যায় এবং এর পূর্ব অংশ বাংলাদেশ নামে এক নতুন রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত হয়।
পাকিস্তানের সংহতি প্রথম আঘাতপ্রাপ্ত হয় রাষ্ট্রভাষা সমস্যাকে কেন্দ্র করে। কায়েদে আযম মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় ঘোষণা দেন যে, একমাত্র ঊর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা ছিল পুরো পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। তারা স্বভাবতই দাবী জানায় ঊর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার। এই দাবী ধীরে ধীরে জমাট বাঁধতে বাঁধতে একসময় আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী পূর্ব পাকিস্তানের খাজা নাজিমুদ্দীন নেতৃত্বাধীন সরকারের অবিবেচকসুলভ হঠকারিতায় পুলিশ ঢাকায় আন্দোলনরত ছাত্রদের উপর গুলি চালায়, যার ফলে নিহত বেশ কয়েকজন ছাত্র। এর ফলে ভাষা আন্দোলন আরো তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী মেনে নেয় এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে ঊর্দুর পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, জিন্নাহ ঊর্দুকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা করার কথা বলেন নি। সেটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক জনপ্রতিনিধিরাই ঠিক করবে বলে তিনি ঘোষণা দেন। ঊর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করার পিছনে জিন্নাহর যুক্তি ছিল এই যে, ঊর্দু পাকিস্তানের কোন নির্দিষ্ট প্রদেশের মাতৃভাষা না হলেও তা ছিল পুরো ভারতের শিক্ষিত মুসলমানদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। অন্যদিকে বাংলা কেবল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণই বুঝতো। পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশ ও ভাষাভাষী মানুষ বাংলা বুঝত না। তাছাড়া মোঘল শাসনামলের শেষের দিকে এসে ঊর্দু ফারসির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৮৬৭ সালের ঊর্দু-হিন্দি বিতর্ক, ১৯৩৭ সালের ওয়ার্ধা স্কীম নিয়ে বিতর্ক ইত্যাদি সময় ঊর্দু উপমহাদেশের মুসলমানদের পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রকাশ পায়। তাই জিন্নাহ যখন ঊর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করছিলেন তখন তাঁর মাথায় এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটই স্পষ্ট ছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান যে পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মত স্রেফ আরেকটি প্রদেশ ছিল না, সেটাও তাঁর বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল। পশ্চিম বঙ্গের বর্ণহিন্দুদের মধ্যে আধুনিক বাংলা ভাষাকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার যে মনোভাব বিদ্যমান ছিল সেখান থেকে বাংলাকে মুক্ত করে তাতে মুসলমানী ভাব স্থান দেয়ার বাঙ্গালী মুসলমানদের যে সংগ্রাম তা ছিল অনেক লম্বা ও শ্রমবহুল। পাকিস্তান আন্দোলনের পিছনেও বাঙ্গালী মুসলমান সাহিত্যিকদের যে অবদান তাও ছিল উল্লেখযোগ্য। এ সম্পর্কে জিন্নাহ হয়তো ততটা ওয়াকিফহাল ছিলেন না। তাই ঊর্দু-বাংলা বিতর্ক এড়িয়ে গিয়ে প্রায়োগিক কারণে ইংরেজিকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এবং ভাষাবিজ্ঞানী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পরামর্শ অনুযায়ী আরবীকে পাকিস্তানের ভবিতব্য রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেশ করলে এই বিতর্ক এড়ানো যেত।
পাকিস্তানের সংহতির উপর আরেকটি বড় আঘাত ছিল পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া, যার প্রমাণ ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিকট মুসলিম লীগের ভরাডুবি। বলা হয়ে থাকে, এর মাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে মুসলিম লীগের প্রভাব একেবারে নাই হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়ার শুরুটা হয় একেবারে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনাকালীন সময়েই। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় করতে যে ব্যক্তিটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখেন তিনি হচ্ছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। অথচ তিনিই পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে খাজা নাজিমুদ্দীনের হাতে এই নেতৃত্ব সোপর্দ করা হয়। এর ফলে সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী এবং তাঁদের অনুসারীগণ মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন। যেহেতু সোহরাওয়ার্দীই পাকিস্তান আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগকে পূর্ব বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলেন, পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগই পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী জনগণের সমর্থন পেতে থাকে এবং এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা কমতে কমতে আস্তে আস্তে শূন্যের কোঠায় পৌঁছায়। মুসলিম লীগ ছিল বাস্তবিক অর্থেই একটি সর্বপাকিস্তানীয় সংগঠন। পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের তিরোধানের ফলে ধীরে ধীরে প্রাদেশিকতার উত্থান ঘটে।
১৯৫৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষে গঠিত যুক্তফ্রন্ট পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করে। যুক্তফ্রন্টের জোটে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ছিলঃ আওয়ামী লীগ এবং শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, আওয়ামী লীগ এবং কৃষক-প্রজা পার্টির দ্বন্দ্ব এত চরমে পৌঁছায় যে, পূর্ব পাকিস্তানে কোন স্থায়ী ও স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে পারে নি। চার বছরের ব্যবধানে বেশ কয়েকবার আওয়ামী লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতে থাকে, যার ফলে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মাদ আলী বগুড়া প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জার আশীর্বাদে পূর্ব পাকিস্তানে পার্লামেন্ট বরখাস্ত করে গভর্নর জেনারেলের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এক বছর পর গভর্নরের শাসন স্থগিত করে পার্লামেন্টারী শাসন ফিরিয়ে আনা হলেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। আওয়ামী লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টির দ্বন্দ্ব এত চরমে পৌঁছে যে, ১৯৫৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী ও কৃষক-প্রজা পার্টির মারামারিতে মারা যান ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী। এর মাত্র কয়েকদিন পরেই আইয়ুব খান ইস্কান্দর মির্জার বিরুদ্ধে ক্যু করে ক্ষমতা দখল করেন এবং পাকিস্তানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মত সামরিক শাসন শুরু হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসে প্রথমে সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক কার্যক্রম আবার বৈধ করা হলে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো আইয়ুব খানকে ক্ষমতা থেকে হটানোর জন্য ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোরাম বা এনডিএফ গঠন করে। আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র চালু করে ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আয়োজন করার ঘোষণা দেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সবগুলো রাজনৈতিক দল মিলে মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতেমা আলী জিন্নাহকে আইয়ুব খানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড় করায়। কিন্তু আইয়ুব খানের কারচুপির কারণে নির্বাচনে ফাতিমা জিন্নাহ পরাজিত হন। এর ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সেতুবন্ধনের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টাও বিফলে যায়।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈন্যরা লাহোর ফ্রন্টে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালী জনগণ সর্বতোভাবে নিজ দেশের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে সমর্থন জানায়। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে। যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান ছিল বলতে গেলে প্রায় পুরোপুরি অরক্ষিত। এ অঞ্চলে মাত্র এক ডিভিশন সৈন্য মোতায়েন করা হয়। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ডক্ট্রিন ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা পশ্চিম পাকিস্তানে নিহিত’। এই ডক্ট্রিনের পিছনে যত যুক্তিই থাকুক না কেন, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে নিজেদের বঞ্চিত ভাবা শুরু করে। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেন যেখানে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে সত্যিকারের ফেডারেশন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পূর্ব পাকিস্তানকে স্বায়ত্ত্বশাসন দেয়ার কথা বলা হয়; সেইসাথে দু প্রদেশের জন্য আলাদা মুদ্রা, আলাদা বাণিজ্যনীতি এবং কর উত্তোলনের ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় সরকার থেকে সংকুচিত করার প্রস্তাব করা হয়। পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবিদ বিশেষ করে সামরিক শাসকরা এটাকে সুপ্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করে। এর সাথে যুক্ত হয় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, যা পাকিস্তানী সামরিক সরকার ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবসহ একাধিক বাঙ্গালী সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দায়ের করে। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে পৌঁছালে সরকার রাউন্ড টেবিল কনফারেন্সে আওয়ামী লীগ যোগদানের শর্ত হিসেবে শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। আইয়ুবের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে হলেও, পূর্ব পাকিস্তানে তা ঠিক আইয়ুব বিরোধী রূপে সীমাবদ্ধ না থেকে পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিমা পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপান্তর নেয়। অবশেষে আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই নতুন সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে গণপরিষদ নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেন। তিনি জনসংখ্যার অনুপাতে সংসদে আসন সংখ্যা বিন্যাস করার ঘোষণা দেন। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৬৯টি আসন এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ১৪৪টি আসন মিলে কেন্দ্রীয় পরিষদে মোট ৩১৩টি আসন হয়। আওয়ামী লীগের সামনে এ ছিল অনন্য সুযোগ। আওয়ামী লীগ ছয় দফা দাবীর ভিত্তিতে ১৯৭০ এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে একটি আসনও লাভ না করে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই জয়লাভ করে এবং এর ফলে পুরো কেন্দ্রীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। অন্যদিকে এ নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জুলফিকার আলী ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৮৮টি আসনে জয়লাভ করে, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান থেকে একটি আসনও লাভ করে নি। ফলে আওয়ামী লীগ ন্যায্যভাবেই তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানায়। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো বেঁকে বসেন। তিনি নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের বিজয়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন সংবিধান প্রণয়নে তার দল ‘পিপল’স পার্টি’-কে শরীক করার আহবান জানায়। আওয়ামী লীগ তাতে অস্বীকৃতি জানালে ভুট্টো ঘোষণা দেন, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কেউ পূর্ব পাকিস্তানে পরিষদে যোগদান করতে গেলে তার ঠ্যাং ভেঙ্গে দেয়া হবে। তবে উল্লেখ্য যে, সেসময় জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানের বাকি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলসমূহ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানায়। অন্যদিকে আগরতলা ষড়যন্ত্র-র কারণে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর উচ্চ পদস্থ অফিসারদের একটি অংশ মুজিবকে দেশদ্রোহী মনে করতেন। তারা মনে করতেন, মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে মুজিব সাংবিধানিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা করে ফেলবেন। ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনের আহবান করে ভুট্টো এবং সামরিক বাহিনীর চাপে ১ মার্চ তা আবার স্থগিত করতে বাধ্য হন। এর ফলে পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগের ঘোষণায় অসহযোগিতা আন্দোলন শুরু হয়। ৭ মার্চের বক্তৃতায় শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্ত্বশাসনের কথা বললেও স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। এই রাজনৈতিক সংকট কাটানোর জন্য ইয়াহিয়া, মুজিব ও ভুট্টোর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলাপ শুরু হয়। ইয়াহিয়া ও মুজিবের একটি আপোষরফায় পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ইয়াহিয়া খান এই বিষয়ে ঘোষণা দিবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও হঠকারিতা দেখিয়ে ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী দিয়ে অপারেশন সার্চ লাইট শুরু করেন। ২৫ মার্চ রাতে সার্চ লাইট অপারেশন শুরু হওয়ার প্রাক্কালে আবদুর রাজ্জাক এবং তাজউদ্দীন আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানে কাছে গিয়ে তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার অনুরোধ জানালেও মুজিব তা করেননি এবং পাকিস্তানী বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় অবস্থানরত বাঙ্গালী সৈন্যরা বিদ্রোহ করে। তাঁদের মধ্যে একজন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে বিদ্রোহ করেন এবং কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের অধীনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ভারতে পালিয়ে যান। ভারতের সর্বোত সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। তাজউদ্দীন আহমেদ অনেকটা নিজ উদ্যোগেই ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল নিজেকে অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত করেন। তবে তাজউদ্দীনের প্রধানমন্ত্রীত্ব তখন আওয়ামী লীগের খন্দকার মোশতাক, শেখ আব্দুল আজিজ, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আ.স.ম. আবদুর রব, আবদুর রাজ্জাকসহ আওয়ামী লীগের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। ভারতে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারে ছিল ব্যাপক আভ্যন্তরীণ কোন্দল। অন্যদিকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর তত্ত্বাবধানে শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল কুদ্দুস মাখন তোফায়েল আহমেদ ইত্যাদি ছাত্রনেতাদের সমন্বয়ে মুজিব বাহিনী গড়ে তোলে, যাদের উপর বাংলাদেশ অস্থায়ী সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধে মুজিব বাহিনীর তেমন কোন ভূমিকা তো ছিলই না; উল্টো বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সাথে তাদের সংঘর্ষও হয়। এমনকি তাজউদ্দীনকে হত্যা করার জন্য মুজিব বাহিনীকে থেকে একজনকে পাঠানোও হয়। অক্টোবর মাসে তাজউদ্দীন আহমেদ ভারতের সাথে সাত দফা গোপন চুক্তি করেন যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের কাছে বিকিয়ে দেয়া হয়। ভারত যখন সেপ্টেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেকটা নিজের আয়ত্ত্বে আনতে সক্ষম হয়, ভারত শীতকালে পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেয় যখন চীন সীমান্তে উপত্যকাগুলো বরফপাতের কারণে বন্ধ থাকবে যাতে পাকিস্তানের সমর্থনে চীনের প্রতি আক্রমণের ঝুঁকি এড়ানো যায়। ভারতীয় সামরিক বাহিনী ও বাংলাদেশী মুক্তিফৌজের একটি যৌথ কমান্ড গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যার নিয়ন্ত্রণ থাকবে ভারতের হাতে। মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী এর বিরোধিতা করলেও এই যৌথ কমান্ড অবশেষে গঠিত হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয় এবং ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্বে মুক্তিফৌজ ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা দখল করতে সক্ষম হয়। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল একেএম নিয়াজী ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের সর্বাধিনায়ক লেফট্যানেন্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন দেশ হিসেবে জন্ম লাভ করে বাংলাদেশ। ভারতীয় বাহিনী ৩১মার্চ ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ থেকে তার সব সৈন্য সরিয়ে নেয়। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ভারতীয় বাহিনী ব্যাপক পরিমাণ সম্পদ লুট করে ভারতে নিয়ে যায়। তারা যশোর, কুমিল্লা, ঢাকা ও চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এবং খুলনা শিল্পাঞ্চলে লুটপাট শুরু করে। ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করা পাকিস্তানের চার ডিভিশন বাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র, খাদ্যশস্য, পাট, সুতা, যানবাহন, সমুদ্রগামী জাহাজ, কারখানার মেশিনপত্র, যন্ত্রাংশ, ফ্রিজ, আসবাবপত্র, ক্রোকারিজ এমনকি বাথরুমের আয়না, ফিটিংস পর্যন্ত লুট করে ভারতে নিয়ে যায়। এই লুটের সম্পদের পরিমাণ ছিলো সবমিলিয়ে সেইসময়ের হিসাবে ২.২ বিলিয়ন ডলার। এই ভারতীয় বাহিনীর এই লুটপাটের বিরোধিতা করার কারণে নবম সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবদুল জলিলকে ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর গ্রেফতার করা হয় এবং তিনিই স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী হন।