মাদকাসক্তি শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো বিশ্বব্যাপী একটি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে আসক্ত তরুণদের নিরঙ্কুশ অংশ যে কেবল নিজেদের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি হারিয়ে জীবনের খেই হারিয়ে ফেলছে তা নয়, বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৮.৩ মিলিয়ন মানুষ তথা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৯% মাদকাসক্ত, যা আৎকে উঠার মত বিষয়।
মাদকাসক্তির ফলে কেবল যে ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতিসাধন হয় তা না, মাদকাসক্তের পরিবারের সুখ-শান্তি, সুনাম নষ্ট হয়, অনেকসময় পরিবার ভাঙ্গনেরও শিকার হয়। মাদকাসক্তরা বেশিরভাগ সময়ই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না, বেশিরভাগ সময়ই হতাশা ও হীনমন্যতায় ভোগে। ফলে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের উপর বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মাদকাসক্তদের একটি বড় অংশ বেকার থাকায় টাকা পয়সার জন্য এবং মাদকের টাকা যোগাড় করার জন্য ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুন-খারাবিসহ বিভিন্ন অপরাধ এবং আইন-শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে।
কেবল অস্থিতিশীল নয়, অনেক সুস্থ ও স্থিতিশীল পরিবারের সন্তানরাও এই ধ্বংসাত্মক নেশায় জড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তির হার দিন দিন বেড়ে যাওয়ার কারণ কি? এর পিছনে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ই মূলত দায়ী। অনেক তরুণ এমনকি কিশোরও স্রেফ রোমাঞ্চকর অনুভূতি নেয়ার জন্য প্রথম প্রথম বিভিন্ন নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করতে গিয়ে তাতে আসক্ত হয়ে পড়ে। তরুণদের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা বিদেশী সংস্কৃতির প্রভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধসমূহ দুর্বল হয়ে যাওয়ার কারণে যে শূন্যতা তৈরী হচ্ছে তারই সুযোগে বিদেশী সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে। সামাজিক মূল্যবোধসমূহ যেখানে পরিবার ও সমাজের জন্য জীবন উৎসর্গের শিক্ষা দেয়, সেখানে বিদেশী আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে পশ্চিমা বস্তুবাদী সংস্কৃতি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের নামে আত্মকেন্দ্রিক জীবনদর্শনকে অনুপ্রাণিত করে। এর ফলে তরুণরা জীবনের সবচেয়ে গঠনমূলক সময়টিতে আনন্দবিলাসের নামে স্বার্থপরের মত মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে নিজেকে, সমাজকে ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।
মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের পথ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমানা), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) এবং গোল্ডেন ওয়েজের (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) কেন্দ্রে অবস্থান হওয়ায় বাংলাদেশে অবৈধ মাদকদ্রব্যের আশঙ্কাজনক বিস্তার ঘটেছে। এ ছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দেশের ৩২টি সীমান্তবর্তী জেলার অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মাদক দেশে আসছে। অনেকসময় দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রভাবশালী সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাও মাদকপাচারের সাথে জড়িত। এর ফলে বাংলাদেশে মাদকদ্রব্য সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। তরুণ, যুবক এমনকি কিশোররা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
মাদকাসক্তিকে দূর করতে হলে প্রথমত সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। বাংলাদেশের মত মুসলিম দেশে একমাত্র ইসলামী মূল্যবোধকে শক্তিশালী করেই মাদকাসক্তির মত সামাজিক ব্যাধিকে কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা যেতে পারে। ইসলাম যেকোন মাদকদ্রব্যকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাদকাসক্তির ফলে স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ব্যঘাত ঘটে তা একমুহূর্তের জন্যও অনুমোদন দিতে রাজি নয়। শরীয়তের ৫টি মাক্বাসিদ বা উচ্চতর লক্ষ্যের একটি হচ্ছে ‘বুদ্ধিবৃত্তির সংরক্ষণ’ (حفظ العقل)। কোরআনে এরশাদ হচ্ছে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ: “হে মুমিনগণ, নিশ্চয় ‘খামর’, জুয়া, প্রতিমা-বেদী ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” [সূরা মায়েদা: ৯০]
আয়াতে বর্ণিত ‘খামর’-এর অর্থ অত্যন্ত ব্যাপক। রাসূলুল্লাহ (সা) ‘খামর’-এর ব্যাখ্যায় বলেন:
كل مُسْكِرٍ خَمْرٌ، وكل مُسْكِرٍ حرام
অর্থ: “প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যই খামর আর প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যই হারাম।” [সহীহ মুসলিম, ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত]
ইসলাম ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উন্নয়নের যে ব্যাপক ও সামগ্রিক ভিশন দেখায় তা তরুণদের ব্যক্তি এবং সমষ্টি তথা সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বের তরে কাজ করার জন্য অনুপ্রাণিত করে তাদের জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে সক্ষম। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً
অর্থ: “আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম লোক হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশী উপকারী। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়তম আমল হল, একজন মুসলিমের হৃদয়কে খুশীতে পরিপূর্ণ করা অথবা তার কোন কষ্ট দূর করে দেওয়া” [ইবনে আবিদ দুনিয়া, ইবনে ওমর থেকে বর্ণিত]
দেশ থেকে মাদকাসক্তি দূর করতে হলে শক্তিশালী সামাজিক-নৈতিক মূল্যবোধসমূহের প্রসারের পরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মাদকপাচার বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। মাদক পাচার ও ব্যবসার সাথে জড়িত সকলকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে। দেশে এই ব্যবসার নেটওয়ার্কের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতে হবে।
পাশাপাশি মাদকাসক্তির নিরাময় এবং মাদকাসক্তদের পুনর্বাসনের জন্য ব্যাপক হারে পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। এসব পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোতে মাদকাসক্তদের কেবল মাদক থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে নয়, বরং তাদেরকে সুচিন্তিত পরিকল্পনা অনুযায়ী (অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য নিজ নিজ ধর্মানুযায়ী) নৈতিক ও কর্মমুখী পুনর্বাসন পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে পুনর্বাসিতরা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে নৈতিকতার সাথে কার্যক্ষমভাবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।