১৮৫৭ সাল। দিল্লির লালকেল্লা মুসলমানদের লালখুনে ভেসে যায়। ১৮৫৭ সালের প্রথম আজাদির যুদ্ধে মুসলমান সৈনিক ও আলেমগণের খুন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে যে নতুন লড়াইয়ের সূচনা হয়, ৯০ বছরের পথ পরিক্রমায় সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা দুনিয়ার নকশা পরিবর্তন করে দেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাবৎ নিয়ম নীতিমালাকে অস্বীকার করে, ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ,ভাষিক জাতীয়তাবাদ সহ সকল জাহেলি তত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জন্ম নেয় ভারতের নির্যাতিত মুসলমানদের স্বপ্নের মিনার পাকিস্তান।কিন্তু রক্ত পিচ্ছিল এ সংগ্রামের কাহিনীর প্রতিটি পাতায় রয়েছে মাজলুম মুসলমানদের ত্যাগ, কোরবানির এক অপূর্ব দাস্তান। ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ ভারতের মুসলমানদের জন্য কতটা নির্মম ভয়ংকর ছিল তার এক জলন্ত উদাহরণ সর্বশেষ মোঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর।
বাহাদুর শাহ জাফরকে গ্রেফতারের পরের সকালে তাঁকে নাস্তার জন্য ডাকা হয়। নাস্তার ট্রের কাপড় সরিয়ে তিনি দেখতে পান তার তিন পুত্র ও কন্যার খন্ডিত মস্তক।এমন হাজারো নির্মম দৃশ্য ও আর্তচিৎকার সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশকে মুসলমানদের জন্য জাহান্নাম করে তোলে। ইংরেজরা অত্যন্ত নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে। কোন ধরনের কোর্ট মার্শাল ছাড়া যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতো তাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে,গাছের ডাল ও দড়িও কম হয়ে যায় বিদ্রোহীদের ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য। আজিমপুরের গোর-এ শহীদ প্রাঙ্গণ এবং পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক আজও সিপাহী বিদ্রোহের সেই নির্মমতার সাক্ষী।
মুসলমানদের এই দুর্দিনে যিনি ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি স্যার সৈয়দ আহমেদ খান। তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেন যে মুসলমানদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া উচিৎ। স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবে ইংরেজদের সাথে সহযোগিতার নীতি অবলম্বন করেন এবং মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক কাজ করেন। তিনি সমগ্র ভারতের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তারই প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়। মুসলমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার অর্থ সংস্থানের জন্য তিনি এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেন।তিনি সকল সামর্থ্যবান মুসলমান পরিবারকে অনুরোধ করেন যেন তারা তাদের প্রতিবেলা খাবার বানানোর সময় এক মুঠো আটা আলাদা করে রাখে। মাস শেষে আটা সংগ্রহ করা হতো এবং তা বিক্রি করে মুসলমান শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার খরচ বহন করা হতো। স্যার সৈয়দ আহমদ খান ইসলামের ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যার সাথে দ্বিমত পোষণ করা সত্ত্বেও মুসলমানদের প্রতি তার ছিল ভীষণ সহমর্মিতা।
মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তারে প্রতিষ্ঠা করেন 'মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্স'। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের সাথে মুসলমানদের পরিচিত করার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'মুসলিম সায়েন্টিফিক সোসাইটি'। ১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মুসলমানদের নতুন এ রাজনৈতিক প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন। কেননা তিনি চাইতেন মুসলমানরা প্রথমে 'রুল অফ দা গেম' শিখুক। এভাবে স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের প্রচেষ্টায় পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত একদল নতুন মুসলমান গড়ে ওঠে যারা পরবর্তীতে পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়।স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের পাশাপাশি নওয়াব আবদুল লতিফ, স্যার সৈয়দ আমীর আলি মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পাকিস্তান আন্দোলনের যৌক্তিকতা প্রথম সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে। বঙ্গভঙ্গের পূর্বে 'বাংলা প্রেসিডেন্সী' নামে যে বৃহৎ আয়তনবিশিষ্ট বঙ্গ প্রদেশ ছিল তার পূর্বাঞ্চলের ৩টি বিভাগ-ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম ছিল পশ্চিমাঞ্চলের পশ্চাদভূমি। পূর্ববাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ বহুদিন ধরে এর বিভক্তি কামনা করে আসছিল। লর্ড কার্জনের নিকট নবাব স্যার সলিমুলস্নাহ ভারতের মুসলিম নেতাদের নিয়ে এর বিভক্তি দাবি করেন। অতঃপর ইংরেজ সরকার ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর ঢাকা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রামের সাথে আসামকে যুক্ত করে 'পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামে একটি নতুন প্রদেশ গঠন করে ঢাকাকে এর রাজধানী ঘোষণা করে।
রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। ফলে মুসলমানগণ নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা লাভে সক্ষম হয়। অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বড় বড় অট্টালিকা গড়ে ওঠায় ঢাকার সৌন্দর্য ঘটে। বঙ্গভঙ্গকে মুসলমানগণ তাদের হৃত গৌরব ও মর্যাদা ফিরে পাবার আনন্দে মেতে ওঠে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ পরিকল্পনাটি কার্যকর করার দিন ঢাকার এক জনসভায় বলেন, "বঙ্গভঙ্গ আমাদেরকে নিষ্ক্রিয়তার হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। এটা আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে কর্ম সাধনায় এবং সংগ্রামে।" অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার গণমানুষের ভাগ্যোন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হয়। হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবিত কলকাতার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নিভর্রশীলতা হ্রাস পায় বঙ্গভঙ্গের ফলে। মুসলমান জনগণ চাকরি ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে উন্নতি লাভ করতে থাকে।
বঙ্গভঙ্গের বিরদ্ধে হিন্দুদের অবস্থান ছিল খুবই কঠিন। বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরাই এর বিরদ্ধে প্রচুর ঝড় তুলেছিল। তারা প্রচার করেন যে, বঙ্গভঙ্গ 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের সমতুল্য।'মূলত কলকাতা কেন্দ্রিক এতদিন ধরে যে আধিপত্য, বঙ্গভঙ্গের ফলে তা কমতে শুরু করে এবং কলকাতার বিপরীতে ঢাকায় নতুন যে সমাজ গড়ে উঠবে তা কলকাতা কেন্দ্রিক উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরা মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গভঙ্গের দিনটিকে কংগ্রেস এবং হিন্দুরা 'কালো দিবস' হিসেবে পালন করে।
১৯০৬ সালের ১লা অক্টোবর স্যার আগা খান, নবাব মুহসিন উল মুলুক এর নেতৃত্বে মুসলমানদের ৩৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভাইসরয়ের সাথে দেখা করেন। এই প্রতিনিধি দল মূলত তিনটা প্রধান দাবি উত্থাপন করেনঃ
১.পৃথক নির্বাচন
২. নতুন দল গঠন
৩.প্রশাসনিক পদসমূহের মুসলমানদের জন্য কোটা প্রদান।
বাকি দুটি দাবি পূরণ না হলেও ভাইসরয় নতুন দল গঠনের দাবিটি মেনে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৬ সালের ৩০শে ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগের প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারতীয় মুসলিম লীগ।এই মুসলিল লীগই সর্বপ্রথম মুসলমানদেরকে স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে ভারতে উপস্থাপন করে এবং পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি তৈরী করে।হিন্দু প্রভাবিত কংগ্রেসে যখন মুসলমানদের সঠিক প্রতিনিধিত্ব সম্ভব হচ্ছিলো না,তখন মুসলিম নেতৃবৃন্দ বাধ্য হয় তাদের জন্য এই আলাদা প্লাটফর্ম তৈরি করতে। মুসলিম লীগের প্রধান দাবীসমূহ ছিলো মুসলমানদের অধিকার ও স্বার্থরক্ষা,ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় রাখা,সরকারি কার্যে মুসলমানদের সংখ্যা এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের সংখ্যার মধ্যকার যে তারতম্য তা দূর করে মুসলমানদের প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা,মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি এবং ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক হাইকোর্ট ও চিফ কোর্টে মুসলমান বিচারপতি নিয়োগ করা ইত্যাদি।
১৯১৬ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক 'লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট'।এই চুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই চুক্তির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় যে মুসলমানরা একটি স্বতন্ত্র জাতি। এরই মধ্যে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যে ব্রিটিশরা তাদের ক্লাবের বাইরে লিখে রাখতে 'Dogs and Indians aren’t allowed' তারাই এই সংকটকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে ধর্না দিতে থাকে। আর তৎকালীন ভারতীয় বাহিনীর ৬৭.১৯% ছিল মুসলমান।কিন্তু তুর্কি খেলাফতের বিরুদ্ধে মুসলমান সৈন্যরা অস্ত্র ধরতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের এই অস্বীকৃতি ব্রিটিশদের গভীর সংকটে ফেলে দেয় পরবর্তীতে তাদের এই প্রতিশ্রুতিতে যুদ্ধ নামানো হয় যে, তুর্কি সালতানাতের অখন্ডতা রক্ষা করা হবে। কিন্তু ব্রিটিশরা বরাবরের মতোই তাদের কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে এবং তুর্কি সালতানাতকে খন্ড-বিখন্ড করে। এরই পরিক্রমায় খিলাফতের অখন্ডতা রক্ষায় ভারতীয় উপমহাদেশে শুরু হয় খেলাফত আন্দোলন। আলী ভ্রাতৃদ্বয় এ আন্দোলনে মুসলমানদের নেতৃত্ব দেন।
১৯১০এর দশকের মুসলমানদের ইতিহাস ছিল মূলত ইংরেজ এবং হিন্দুদের দ্বারা ধোঁকায় পরিপূর্ণ। ১৯১১ এর বঙ্গভঙ্গ রদ, ১৯১৬ লক্ষ্ণৌ প্যাক্ট,১ম বিশ্বযুদ্ধের ধোঁকা এরই কয়েকটি দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই দশকেই ভারতের মুসলমানরা এমন একজনকে পান যিনি পরবর্তীতে মুসলমানদের মুক্তি আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন।মাওলানা জওহরের আমন্ত্রণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯১৩ সালে মুসলিম লীগে যোগ দান করেন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রচেষ্টায় মুসলিম লীগ ইংরেজদের সাথে সহযোগীতার নীতি থেকে সরে আসে এবং প্রথমবারের মতো 'স্ব-শাসন' (self government) এর দাবী তোলে।
১৯২৮ সালে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে ভারতের শাসন-কাঠামোর ব্যাপারে নেহরু রিপোর্ট প্রস্তাবিত হয়।মুসলিম লীগ সেই রিপোর্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ১৯২৯ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে জিন্নাহ তাঁর চৌদ্দদফা প্রস্তাব পেশ করেন। ওই অধিবেশনে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, ভারতবর্ষের জন্য ভবিষ্যতে প্রণীতব্য যেকোনো ধরনের সংবিধান মুসলমানদের নিকট গ্রহণযোগ্য হবে না যদি তাতে জিন্নাহ কর্তৃক উপস্থাপিত চৌদ্দদফা প্রস্তাবের মৌলিক নীতিমালার প্রতিফলন না ঘটে। কাজেই নেহরু রিপোর্টের পাল্টা প্রস্তাব হিসেবে মুসলমানরা চৌদ্দদফায় বিধৃত তাদের নিজস্ব দাবি তুলে ধরে। বস্তুত চৌদ্দদফা ছিল নেহরু রিপোর্টে প্রকাশিত প্রস্তাবের পাল্টা দাবি যা মুসলমানদের আলাদা করে অধিকারের দাবি জানায়।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে বলা হতো হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অগ্রদূত। তিনি পশ্চিমা রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলন দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিলেন। তিনি ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানে ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদকে চূড়ান্ত সমাধান মনে করতেন। কিন্তু কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক আচরণ এবং জওহরলাল নেহেরুর রিপোর্ট তার এই বিশ্বাসের মোহভঙ্গ ঘটায়। কংগ্রেস তথা হিন্দু নেতৃবৃন্দ শুধুমাত্র হিন্দুদের মতামত কে সার্বজনীন মতামত হিসেবে গণ্য করত যার প্রমাণ পাওয়া যায় জওহরলাল নেহেরুর নিম্নোক্ত উক্তিতে "We are responsible to give suggestion to the British govt. because we are the majority". এভাবে কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক আচরণ, কংগ্রেসের প্রতি ব্রিটিশ রাজের পক্ষপাত, মুসলমানদের দুরবস্থা এবং সামগ্রিকভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বেষী আচরণ তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মতাদর্শ পরিবর্তনে বাধ্য করে। অতঃপর তিনি ভারতের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং মুসলমানদের মুক্তির জন্য মুসলিম জাতীয়তাবাদের আস্থা রাখেন।
১৯৩০ সালে এলাহাবাদে মুসলিম লীগের কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় এবং এই সম্মেলনে আল্লামা ইকবাল ভারতের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল সমূহ নিয়ে আলাদা প্রদেশ গঠনের দাবি জানান। এই ভাষণকেই 'পাকিস্তান রাষ্ট্রের' তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লামা ইকবালের এই স্বপ্ন তথা ইলহামই পরবর্তীতে সমগ্র ভারতের মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ইকবাল তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে মুসলমানদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তাবোধ এবং তাদের আত্মপরিচয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষদের ভূমিকা ইত্যাদির স্মরণ করিয়ে দেন এবং মুসলিম পুনর্জাগরণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মূলত পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান তাত্ত্বিক ও স্বাপ্নিক ছিলেন আল্লামা ইকবাল।ড.ইকবাল তাঁর প্রস্তাবিত মুসলিম রাষ্ট্রের কোন নাম দেননি। এ কাজটি করেছেন চৌধুরী রহমত আলী।
১৯৩৩ সালের জানুয়ারী মাসে, চৌধুরী রহমত আলী এবং তাঁর ক্যাম্ব্রিজের তিনজন সহকর্মী “নাউ অর নেভার” (Now or Never) শীর্ষক একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন। চৌধূরী রহমত আলী তাঁর প্রচারপত্র ভারতের মুসলিম নেতৃবৃন্দের কাছে, লন্ডনে অনুষ্ঠিত তৃতীয় গোল টেবিল বৈঠকে যোগদানকারী মুসলিম ডেলিগেটদের কাছে এবং ইংল্যান্ডের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নিকট প্রেরণ করেন। একখানি পত্রসহ প্রচারপত্র পাঠানো হয় তাতে বলা হয় “আমি এতদসহ পাকিস্তানের তিন কোটি মুসলমানের পক্ষ থেকে একটি আবেদন আপনাদের সামনে পেশ করছি, যারা ভারতের উত্তরাঞ্চলে পাঁচটি প্রদেশে বাস করে যথা পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান { উল্লখ্য চৌধুরী রহমত আলী উপরোক্ত পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের দাবী করেন যার নাম তিনি পাকিস্তান’দেন}”।
উল্লেখ্য লাহোর প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দের উল্লেখ না থাকলেও হিন্দু পত্রিকাসমূহ একে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে অভিহিত করে। আর এটাই ছিল যথার্থ। বহু দিন পূর্বে চৌধুরী রহমত আলীর দেয়া নামটাই সার্থকতা লাভ করে।
১৯৩৫ এর ভারত শাসন আইন অনুসারে ১৯৩৭ এ সমগ্র ভারতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে কংগ্রেস নয়টি প্রদেশের মধ্যে সাতটি প্রদেশে সরকার গঠনে সমর্থ হয় এবং মুসলিম লীগ শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় মুসলিম লীগকে 'Moribund Party' (মৃতপ্রায় দল) হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু মুসলিম লীগের এই পরাজয় ছিল প্রকৃতপক্ষে এক ধরনের 'Blessing in disguise'। কেননা এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কংগ্রেস ২ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসে এবং এই ২ বছরের কংগ্রেসি দুঃশাসন মুসলমানদের হারানো সম্বিৎ ফিরিয়ে দেয়। সরকারি অফিসসমূহে গান্ধীর ছবি টানানো বাধ্যতামূলক করা হয় এবং মন্দিরসমূহে স্কুল খুলে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদেরকে সেখানে যেতে উদ্বুদ্ধ করা হয়। আজানের সময় মসজিদের সামনে ড্রাম বাজানো হতো এবং সর্বোপরি বোম্বে, ঢাকা সহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে যার প্রধান শিকার হয় মুসলমানরা।
কিন্তু এই সমস্ত সমস্যাগুলোর সমাধানে সরকার কোন ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি। যার ফলে এই দুই বছরে কংগ্রেসের দুঃশাসন থেকে মুসলমানরা মুক্তির প্রহর গুনতে থাকে। বহুল প্রতীক্ষার পর আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন -২২ই ডিসেম্বর, ১৯৩৯।এই দিনে দুই বছরের কংগ্রেসি দুঃশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয় এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আহ্বানে সারা ভারতের মুসলমানরা 'ইয়াওম-এ-নাজাত' বা 'মুক্তির দিন' পালন করে এবং আল্লাহর কাছে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে। দুই বছরের কংগ্রেসের দুঃশাসন মূলত এই ধারণা প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করে দেয় যে, হিন্দু শাসনের অধীনে মুসলমানদের মৌলিক মানবাধিকারসহ শান্তিপূর্ণ জীবনধারণ এক প্রকার অসম্ভব। এই দুঃশাসনই মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমির দাবির যৌক্তিকতা এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ এর সার্থকতা সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪০ সালের ২২ শে মার্চ পাঞ্জাবের রাজধানী লাহোরে শুরু হয় 'অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের' সম্মেলন। ২৩ই মার্চ শেরে বাংলা একে ফজলুল হক উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক 'পাকিস্তান প্রস্তাব'।লাহোর প্রস্তাব/পাকিস্তান প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করেন তৎকালীন পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী খিজির হায়াত তিওয়ানা।সেদিনের সম্মেলনে ছিল পিনপতন নীরবতা। উপস্থিত অনেক সাংবাদিকের ভাষ্যমতে,যদি সেদিনের সম্মেলন একটি সুচঁও মাটিতে পড়তো, তবে তার আওয়াজও শোনা যেত। কেননা জনগণ অত্যন্ত নীরবতা ও আগ্রহের সাথে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং শেরে বাংলার বক্তব্য শোনার জন্য অপেক্ষা করেছিল।
হিন্দু কংগ্রেসের সর্ব ভারতীয় জাতীয়তা আন্দোলন তথা অখণ্ড ভারতে রামরাজ্যে স্থাপনের আন্দোলনে মুসলমান জাতি যখন বিভ্রান্ত ও পথহারা হয়েছিল, তখন মাওলানা মওদূদী উক্ত জাতির সম্মুখে সত্যের মশাল প্রজ্জ্বলিত করে পথের সন্ধান দিয়েছিরেন এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি “আল জিহাদু ফিল ইসলাম” গ্রন্থে ইসলামকে একটা সত্যিকার আদর্শবাদী বিপ্লবী আন্দোলন হিসেবে পেশ করেছেন এবং মুসলমান জাতির কর্তব্য, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বর্ণনা করেছেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের অন্ধ কংগ্রেসপ্রীতির জন্যে তিনি “আল জমিয়ত” পত্রিকার সংস্রব বর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে মিঃ মুহম্মদ আলী জিন্নাহর (তখনও তিনি কায়েদে আযম হননি) ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা ইংল্যান্ডের গোল টেবিল বৈঠকে গৃহীত হওয়ার পর হিন্দু জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসের বিপক্ষে মুসলিম লীগ এক আত্মরক্ষামূলক আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এটাও প্রকৃতপক্ষে কোনও সুষ্ঠু আদর্শবাদী আন্দোলন ছিল না।
বলাবাহুল্য, কংগ্রেসের বহুদিনের সাধনা ছিল সকল জাতির সমন্বয়ে একটা ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক জাতি গঠন। এর ভয়াবহতা উপলব্ধি করে মুসলমানগুণ তা থেকে আত্মরক্ষার জন্যে অপর এক ভ্রান্ত পথ অবলম্বন করছিল। আর তা ছিল হিন্দু সভ্যতা-সংস্কৃতি প্রভাবিত একজাতীয়তার পরিবর্তে মুসলিম জাতীয়তা। প্রকৃতপক্ষে উভয় প্রকারের জাতীয়তাই মারাত্মক। তাই মাওলানা মওদূদী তাঁর “সিয়াসী কাশমকাশ” গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে প্রথমত ইসলামের মূল লক্ষ্য, আদর্শ এবং রাজনৈতিক ভূমিকার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেন। অতঃপর উক্ত গ্রন্থেরই দ্বিতীয় খণ্ডে কংগ্রেসের কাম্য জাতীয়তাবাদের দোষত্রুটি ও ভয়াবহ পরিণামের ফল বিশ্লেষণ করেন। তারপর ভারতীয় মুসলমানগণ মুসলিম লীগের নেতৃত্বে যে মুসলিম জাতীয়বাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল, তারও ভয়াবহ পরিণাম বিশ্লেষণ করেন। বস্তুত ইসলাম কোন জাতীয়তাবাদ দৃষ্টি করতে অথবা কোন National State (জাতীয় রাষ্ট্র) কায়েম করতে আসেনি। বরং দুনিয়ার বুকে একটা সুষ্ঠু আদর্শ, জীবন দর্শন, সমাজ দর্শন উপস্থাপিত করে একটা Ideogical বা আদর্শ রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। এ গ্রন্থে (সিয়াসী কাশমাকাশ ২য় খন্ডে) মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের পরিবর্তে একটা ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের কথাই বলা হয়েছে।
১৯৩৫ সালের পর থেকে ভারতীয় মুসলমান যে রাজনৈতিক ঘূণিপাকের আবর্তে পড়ে দিকভ্রান্ত হয়েছিল মাওলানা তৎপ্রণীত ‘তানকিহাত’, ‘সিয়াসী কাশমাকাশ্’, ‘পর্দা’, ‘তাজ্বদীদ ওয়া ইহ্ইয়ানে দ্বীন’ প্রভৃতি গ্রন্থে সে সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চরণ করে সমাধান পেশ করেন।
কংগ্রেসের সর্বনাশা আন্দোলন মাওলানা কোনদিনই সমর্থন করতে পারেননি। বরং কংগ্রেস থেকে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে মুসলমানদের একটা স্বতন্ত্র আদর্শবাদী দল বা জাতি হিসেবেই বসবাস করতে হবে- এ ছিল তাঁর বক্তব্য। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও আদর্শ নৈতিকতা বিস্মৃত হয়ে মুসলমানগণ ইউরোপীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছিল। তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন এবং ‘তানকিহাত’ গ্রন্থের মাধ্যমে ইউরোপীয় সভ্যতার বিষবৃক্ষের বিষময় পরিনাম ফল চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। তাঁর যাবতীয় লেখনী ও চেষ্টা-চরিত্রের মূল লক্ষ্যই এই ছিল যে, মুসলমানদের একটা আদর্শ জাতি হিসেবে দুনিয়ায় মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে এবং মানবের সমগ্র জীবনে একমাত্র আল্লাহ তায়ালরই অনুশাসন পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে পরবর্তীকালে এটাই পাকিস্তান আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করেছিল।
কংগ্রেস কিন্তু বরাবরই তার আপন লক্ষ্যে অবিচল ছিল। অর্থাৎ সমগ্র ভারতে একজাতীয়তা সৃষ্টি এবং তারই ভিত্তিতে দেশের স্বাধীনতা লাভ। ভৌগলিক ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করে ভারতীয় মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে হিন্দু-কংগ্রেস একজন শ্রেষ্ঠ আলেমকে কাজে লাগালো। ভারতের শ্রেষ্ঠতম ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দেওবন্দের হাদীস শাস্ত্রের অধ্যক্ষ মরহুম হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী একদা লাহোর জামে মসজিদে কোরআন হাদীস উদ্ধৃত করে ভারতের হিন্দু-মুদলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-জৈন নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে এক ভৌগলিক জাতি প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন। তাঁর বক্তৃতা পুস্তিকাকারেও প্রকাশিত হলো।
এ সময়ে মুসলিম লীগ আন্দোলন বেশ দানা বেঁধে উঠছিল এবং মুসলমানদেরকে একটা স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে পেশ করেই এ আন্দোলন এতদুর অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু বিখ্যাত শিক্ষাকেন্দ্রের হাদীস শাস্ত্রের অধ্যক্ষের মুখে মুসলিম-অমুসলিমের সমন্বয়ে একজাতীয়তার যুক্তি-প্রমাণ শুনে মুসলিম লীগমহল এবং সাধারণভাবে মুসলিম ভারত স্তম্ভিত, বিস্ময়বিমূঢ় ও নিরাশা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়লো। এ সময়ে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক কবি ইকবাল রোগ শয্যায় শায়িত ছিলেন। তিনি রোগশয্যায় মাদানী সাহেবের উক্তির বিষয় জানতে পেরে অত্যন্ত ব্যথিত ও চঞ্চল হয়ে পড়েন। তিনি ধীরে ধীরে কম্পিত কলেবরে শয্যার উপর উঠে বসেন এবং স্বভাব-কবি রোগ যন্ত্রণার মধ্যেই কবিতার সুরে মাওলানা মাদানী সাহেবের উক্তির তীব্র সমালোচনা করেন-
আজম হনুয ন দানিস্ত্ রমুযে দীঅরনা,
যে দেওবন্দ্ হুসাইন আহমদ ইঁচে বুল্ আজবীস্ত্।
সরুদে বরসরে মেম্বর কে মিল্লাত আয ওতনস্ত্।
চে বেখবরয আয্ মকামে মুহাম্মদে আরবীস্ত।
বমুস্তফা বরেসাঁ খেশরা কে দী হমা উস্ত্আগর
বাউ না রসীদী তামামে বু লহবীস্ত।
অর্থাৎ-
বোঝেনি ঐ আজমবাসী
দ্বীনের মর্ম বিহ্বলতা,
দেওবন্দে তাইতো হুসেন
আহমদ কন আজব কথা।
“ওয়াতন থেকে মিল্লাত হয়”
এই কথা ফের গান যে তিনি,
বোঝেননি হায় নবীর মকাম
আল আরবীর মান যে তিনি।
নবীর কাছে পৌঁছিয়ে দাও
নিজেকে- এই দ্বীনের দাবি।
পৌঁছাতে না পারো যদি
সবই হবে ‘বু-লাহাবী’।
বলা বাহুল্য, ডাঃ ইকবালের কয়েক ছত্র কবিতা যদিও মরহুম মাদানী সাহেবের মতবাদকে কশাঘাত করলো, তথাপি তা একজাতীয়তা মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে ভারতীয় মুসলমান এবং মুসলিম লীগ তাদের আন্দোলনকে কুয়াশাচ্ছন্ন দেখে দিশাহারা হয়ে পড়লো। ঠিক এই সংকট মুহুর্তে মাওলনা মওদূদী তাঁর বলিষ্ঠ মসি চালনা শুরু করেন এবং “মাসয়ালায়ে কওমিয়ত” নামে একখানা বিপ্লবাত্মক অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেন।
এখানে মরহুম মাওলানা মাদানী সাহেবের উক্তির কিঞ্চিৎ উল্লেখ প্রয়োজন বোধ করছি। তিনি তাঁর বক্তৃতায় এটাই প্রমাণ করতে চেষ্টা করেন যে, বর্তমানকালে জাতি ভৌগলিক আঞ্চলিকতার ভিত্তিতেই গঠিত হয়। তিনি তাঁর উক্তি প্রমাণ করার জন্য প্রথমেই বলেন-
“একজাতিতত্বের বিরোধিতা এবং উহাকে ন্যায়নীতির বিপরীত প্রমাণ করার প্রসঙ্গে যাহা কিছু প্রকাশিত হইয়াছে এবং হইতেছে তাহার ভুলত্রুটি দেখাইয়া দেওয়া এখন জরুরী মনে করিতেছি। কংগ্রেস ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ হইতে ভারতবাসীর নিকট স্বদেশিকতার ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্যের দাবি করিয়া যথেষ্ট পরিমাণে চেষ্টা ও সাধনা করিতেছে। উহার বিরোধী শক্তিসমূহ ইহার অস্বীকার যোগ্য হওয়া বরং নাজায়েয ও হারাম হওয়ার কথা প্রমাণ করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করিতেছে। বস্তুতঃ ব্রিটিশ সম্রাজ্যবাদের পক্ষে ইহা অপেক্ষা মারাত্মক আর কিছুই নাই। ইহা আজ নয়, ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে কিংবা তাহার পূর্ব হইতে এইসব কথা প্রকাশ করা হইয়াছে।”
তিনি আরও বলেন-
“একজাতীয়তা যদি এমনই অভিশপ্ত ও নিকৃষ্ট বস্তু হইয়াও থাকে, তবুও ইউরোপীয়গণ যেহেতু এই অস্ত্র প্রয়োগ করিয়াই ইসলামী বাদশাহী ও ওসমানী খেলাফতের মূলোচ্ছেদ করিয়াছিল, তাই এই হাতিয়ারকেই ব্রিটিশের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা আজ মুসলমানদের কর্তব্য।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ- পৃষ্ঠা ৪৩)।
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী মরহুম সাহেবের উক্তির প্রত্যুত্তরে যে বিপ্লবী গ্রন্থ (“ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ” মাওলানা মওদূদী প্রণীত উর্দূ গ্রন্থ “মাসয়ালায়ে কওমিয়তের” বাংলা অনুবাদ।) রচনা করেন তার প্রারম্ভে তিনি বলেন-
“দারুল উলুম দেওবন্দের প্রিন্সিপাল জনাব মাওলানা হুসাইন আহমেদ মাদানী ‘একজাতিতত্ত্ব ও ইসলাম’ নামে একখানি পুস্তিকা লিখিয়াছেন। একজন সুপ্রসিদ্ধ আলেম এবং পাক-ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের লিখিত এই পুস্তিকায় ‘জটিল জাতিতত্ত্বের’ সরল বিশ্লেষণ এবং প্রকৃত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ অভিব্যক্তি হইবে বলিয়া স্বভাবতই আশা করা গিয়াছিল। কিন্তু ইহা পাঠ করিয়া আমাদিগকে নির্মমভাবে নিরাশ হইতে হইয়াছে এবং এই বইখানিকে গ্রন্থকারের পদমর্যাদার পক্ষ্যে হানিকর বলিয়া মনে হইয়াছে। বর্তমান যুগে অসংখ্য ইসলাম বিরোধী মতবাদ ইসলামের মূলতত্ত্বের উপর প্রবল আক্রমণ চালাইতে উদ্যত, ইসলাম আজ ইহার নিজের ঘরেই অসহায়। স্বয়ং মুসলমানগণ দুনিয়ার ঘটনাবলী ও সমস্যাবলী খালেছ ইসলামের দৃষ্টিতে যাচাই করে না।
বলা বাহুল্য, নিছক অজ্ঞানতার দরুনই তাহারা উহা করিতে পারিতেছে না। উপরন্তু ‘জাতীয়তার’ ব্যাপারটি এতই জটিল যে, উহাকে সুস্পষ্টরূপে হৃদয়ঙ্গম করার উপরই এক একটি জাতির জীবন-মরণ নির্ভর করে। কোন জাতি যদি নিজ জাতীয়তার ভিত্তিসমূহের সহিত সম্পূর্ণ ভিন্ন মূলনীতির সংমিশ্রণ করে, তবে সে ‘জাতি’ হিসাবে দুনিয়ার বুকে বাঁচিতে পারে না। এই জটিল বিষয়ে লেখনী ধারণ করিতে গিয়া মাওলানা হুসাইন আহমেদ সাহেবের ন্যায় ব্যক্তির নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল। কারণ তাঁহার নিকট নবীর আমানত গচ্ছিত রহিয়াছে। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও মূল তত্ত্বের উপর যদি কখনওজঞ্জাল-আবর্জনা পুঞ্জীভুত হয়, তবে ইহাদের ন্যায় লোকদেরই তাহা দূরভূত করা কর্তব্য।
বর্তমান অন্ধকার যুগে তাঁহাদের দায়িত্ব যে সাধারণ মুসলমানদের অপেক্ষা অনেক বেশি এবং কঠোর, সে কথা তাহাদের পুরাপুরিই অনুধাবন করা উচিৎ ছিল। সাধারণ মুসলমান যদি ভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত থাকে, তবে সে জন্যও সর্বপ্রথম এই শ্রেণীর লোক দিগকেই দায়ী করা হইবে। সেই জন্য আমাকে আবার বলিতে হইতেছে যে, মাওলানা মাদানীর এই পুস্তিকায় তাঁহার দায়িত্বজ্ঞান ও দায়িত্বানুভূতির কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ – পৃষ্ঠা ৪১)।
সমগ্র ভারতবাসীর ”একজাতিতত্ত্বকে” সঙ্গত বলে প্রমাণ করার জন্যে মাওলানা মাদানী সাহেব আর একটি দলীল পেশ করেছেনঃ
“আমরা প্রতিদিন সম্মিলিত স্বার্থের জন্য জনসংঘ বা সমিতি গঠন করিয়া থাকি এবং তাহাতে শুধু অংশগ্রহণই করি না, উহার সদস্যপদ লাভ করিবার জন্যুদ প্রাণপণ চেষ্টাও করিয়া থাকি। …. শহর এলাকা, ঘোষিত এলাকা, মিউনিসিপ্যাল বোর্ড, জেলা বোর্ড, ব্যবস্থা পরিষদ, শিক্ষা সমিতি এবং এই ধরনের শত শত সমিতি রহিয়াছে যাহা বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্য নির্দিষ্ট নিয়মনীতি অনুসারে গঠিত হইয়াছে। এই সব সমিতিতে অংশগ্রহণ করা এবং সেজন্য সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে চেষ্টা করাকে কেহই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে না। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ই ধরনের কোন সমিতি যদি দেশের স্বাধীনতা এবং বৃটিশ প্রভুত্বের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তাহাতে অংশগ্রহণ করা হারাম, ন্যায়পরায়ণতার বিপরীত, ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী এবং জ্ঞানবুদ্ধি ইত্যাদির বিপরীত হইয়া যায়।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ – ৫২ পৃষ্ঠা)।
তদুত্তরে মাওলানা মওদূদী বলেন-
“বস্তুত ইহাকেই বলে ভুলের ভিত্তিতে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ। মাওলানা মাদানী একটি পাপের কাজকে ফরয গণ্য করতঃ উহারই অন্ধ প্রেমে পড়িয়া অনুরূপ আর একটি পাপকে সঙ্গত প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিতেছেন। অথচ উভয় ক্ষেত্রেই হারাম হওয়ার একই মূল কারণ বিদ্যমান। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলিতে চাই, উলামায়ে হিন্দের নিকট কিউন্সিল ও এসেম্বলীতে যোগ দেওয়াকে একদিন হারাম এবং অন্যদিন হালাল বলিয়া ঘোষণা করা একেবারে পুতুল খেলার শামিল হইয়াছে। কারণ প্রকৃত ব্যাপার লক্ষ্য করিয়া কোন জিনিসকে হারাম ঘোষণা করার নীতি তাহাদের নয়। গান্ধীজীর একটি শব্দেই তাহাদের ফতোয়াদান ক্ষমতা সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আমি ইসলাম শাশ্বত ও অপরিবর্তনীয় নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে বলিতেছি, আল্লাহ ও তাহার রাসূল (সাঃ) যে সব বিষয়ে সুস্পষ্ট ফয়সালা করিয়াছেন, সে সম্পর্কে নতুত ভাবে ফয়সালা করিবার নিরঙ্কুশ অধিকার মানুষকে দেয় যেসব সামগ্রিক প্রতিষ্ঠান- মুসলমানদের পক্ষে তাহা সমর্থন করা এক চিরন্তন অপরাধ সন্দেহ নাই। কিন্তু এইরূপ নিরঙ্কুশ অধিকার ও কর্তৃত্বসম্পন্ন সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহে অমুসলিমদের সংখ্যা অধিক হইয়া পড়ে এবং তাহাতে সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতেই যাবতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তখন ইহা দ্বিগুণ অপরাধরূপে পরিগণিত হয়।
অতএব এইসব সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের কর্মসীমা খোদার শরীয়তের নির্দিষ্ট সীমা হইতে স্বতন্ত্র করিয়া দেওয়াই মুসলমানদের প্রথম কর্তব্য এবং তাহাদের পক্ষে প্রকৃত আযাদী যুদ্ধ ইহাই। কর্তৃত্ব প্রয়োগের উল্লিখিত সীমা উভয়ের যদি সতন্ত্র হয়, তবে মুসলিম অমুসলিম উভয় জাতির কোন মিলিত স্বার্থের জন্য গঠিত দলের সহযোগিতা করা মুসলমানদের পক্ষে সঙ্গত হইবে। তাহা কোন শত্রুর আক্রমনের প্রতিরোধের জন্য হউক, কি কোন অর্থনৈতিক বা শৈল্পিক কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার জন্য হউক, তাহাতে কোনরূপ পার্থক্য নাই। কিন্তু উভয় জাতির কর্ম ও ক্ষমতার সীমা যতদিন পরস্পর যুক্ত থাকিবে, মিলন ও সহযোগিতা তো দূরের কথা এইরূপ যুক্ত শাসনতন্ত্রের অধীন জীবনযাপন করাও মুসলমানদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসঙ্গত। এই ব্যাপারে নির্বিশেষে সকল মুসলমানই অপরাধী বলিয়া বিবেচিত হইবে, যতদিন না তাহারা সকলে মিলিয়া মিলিত শক্তির সাহায্যে উক্ত শাসনতন্ত্রকে চূর্ণ করিয়া দিবে। আর যাহারা সাগ্রহে এই শাসনতন্ত্র গ্রহণ করিবে এবং উহাকে চালু করার জন্য চেষ্টা করিবে তাহারা তদপেক্ষা বেশী অপরাধী হইবে। কিন্তু যে ব্যক্তি, সে যে-ই হউক না কেন, সেই শসনতন্ত্র চালু করার অনুকূলে কোরআন-হাদীস হইতে যুক্তি পেশ করিবে, তাহার অপরাধ হইবে সর্বাপেক্ষা বেশী।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ- পৃষ্ঠা ৫৩)
কংগ্রেসের একজাতীয়তার বিষময় ফল লক্ষ্য করে মওলানা মওদূদী বলেন-
“এই উদ্দেশ্যেই ওয়ার্ধা স্কীম রচনা করা হইয়াছে। বিদ্যামন্দির স্কীমেরও ইহাই উদ্দেশ্য ছিল। এই উদ্দেশ্য এই উভয় স্কীমেই স্পষ্ট ভাষায় লিখিয়া দেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু মাওলানা মাদানী এই সব স্কীম এবং উহাদের পাঠ্য তালিকা মোটেই দেখেন নাই। পণ্ডিত নেহেরু কয়েক বছর পর্যন্ত এই জাতীয়তারই শিক্ষা ফুঁকিতেছেন। কিন্তু তাঁহার কোন বক্তৃতা বা রচনাও মাওলানা মাদানীর গোচরীভূত হয় নাই। কংগ্রেসের দায়িত্বসম্পন্ন প্রত্যেকটি ব্যক্তি এই কথাই ঘোষণা করিতছেন, লিখিতেছেন এবং নতুন শাসনতন্ত্রলব্ধ রাষ্ট্রশক্তির সাহায্যে তাহা প্রবলভাবে প্রচারও করিয়া বেড়াইতেছেন। কিন্তু মাওলানা মাদানী ইহার কিছুই শুনিতে, দেখিতে ও অনুভব করিতে পারিতেছেন না। অথচ তিনি যে সব সামগ্রিক প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহাদের প্রত্যেকটির দ্বারাই এইসব কাজ সম্পন্ন করা হইতেছে।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ- পৃষ্ঠা ৫৯-৬০)।
মাওলানা মওদূদী আরও বলেন-
“সুতরাং মাওলানা মাদানী যদি তাঁহার মনোভাব ব্যক্ত করার জন্য ‘পারস্পারিক বন্ধুতা’ ইত্যাদি কোন শব্দ ব্যবহার করিতেন এবং ইহাকে কংগ্রেসের নীতি ও কর্ম হিসাবে পেশ না করিয়া নিজের তরফ হইতে একটি প্রস্তাবও সুপারিশ হিসাবে পেশ করিতেন, তবেই ভাল হইত। অন্তত এখনও যদি তিনি এই জাতির প্রতি এতটুকু অনুগ্রহ করেন, তবে তাহা বড়ই মেহেরবানী হইবে। অন্যথায় তাঁহার লেখনীতে মহা বিপর্যয় সৃষ্টি হওয়ার পূর্ণ সম্ভাবনা রহিয়াছে। জালেম রাজা বাদশাহ ও ফাসেক রাষ্ট্রনেতা যাহা কিছু করিয়াছেন, আলেমগণ তাহাকেই কোরআন হাদীসের দলীল দিয়া সত্য প্রমাণ করত ধর্মকে অত্যাচার ও শোষণের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিাছেন।
মাওলানা মাদানীর উল্লিখিত পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর খালেছ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে ‘জাতীয়তার’ বিশ্লেষন করা এবং এই ব্যাপারে ইসলামী ও অনৈসলামিক মতবাদের পারস্পরিক মূলগত পার্থক্য উজ্জ্বল করিয়া ধরা অত্যান্ত জরুরী হইয়া পড়িয়াছে। তাহা করা হইলে এ সম্পর্কীয় যাবতীয় ভুল ধারণা লোকের মন হইতে দূর হইবে এবং উভয় পথের কোন একটি পথ বুঝিয়া-শুনিয়া গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হইবে। ইহা আলেমদেরই কত্যর্ব ছিল, কিন্তু আলেম সমাজের প্রধান ব্যক্তিই যখন একজাতীয়তার পতাকা উত্তোলন করিয়াছেন এবং কোন আলেমই যখন প্রকৃত কর্তব্য পালনে প্রস্তুত হইতেছেন না, তখন আমাদের ন্যায় সাধারণ লোকেরাই তজ্জন্য তৎপর হইতে হইবে।” (ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ – পৃষ্ঠা ৬১)।
এ গ্রন্থে তিনি ইসলামী জাতীয়তার ভিত্তি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ
“যেসব গন্ডীবদ্ধ, জড় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ও কুসংস্কারপূর্ণ ভিত্তির উপর দুনিয়ার বিভিন্ন জাতীয়তার প্রাসাদ গড়ে উঠেছ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন। বর্ণ, গোত্র, জন্মভূমি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অবৈজ্ঞানিক বিরোধ ও বৈষম্যের ভিত্তিতে মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও চরম অজ্ঞতার দরুন মানবতাকে চূর্ণ করে দেয় এবং মানবতার দৃষ্টিতে সমস্ত মানুষকে সমশ্রেণীর সমমর্যাদা সম্পন্ন ও সমানাধিকার প্রদান করেছে।”
“ইসলামী জাতীয়তার মানুষে মানুষে পার্থক্য করা হয় বটে, কিন্তু জড়, বৈষয়িক ও বাহ্যিক কোন কারণে নয়। করা হয় আধ্যাতিক, নৈতিক ও মানবিকতার দিক দিয়ে। মানুষের সামনে এক স্বাভাবিক সত্য বিধান পেশ করা হয়, যার নাম ইসলাম। আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্য, হৃদয়মনের পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা, কর্মের অনাবিলতা, সততা ও ধর্মানুসরণের দিকে গোটা মানব জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে যে, যারা এ আমন্ত্রণ গ্রহণ করবে, তারা এক জাতি হিসাবে গণ্য হবে। আর যারা তা অগ্রাহ্য করবে, তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ মানুষের একটি হচ্ছে ঈমান ও ইসলামের জাতি এবং তার সমস্ত ব্যক্তিসমষ্টি মিলে একটি উম্মাহ। অন্যটি হচ্ছে কুফর ও ভ্রষ্টতার জাতি। তার অনুসারীগণ নিজেদের পারস্পরিক মতবিরোধ ও বৈষম্য সত্ত্বেও একই দল ও একই দলের মধ্যে গণ্য।”
“এ দুটি জাতির মধ্যে বংশ ও গোত্রের দিক দিয়ে কোন পার্থক্য নেই। পার্থক্য বিশ্বাস ও কর্মের। কাজেই একই পিতামাতার দু’টি সন্তানও ইসলাম ও কুফরের উল্লিখিত ব্যবধানের দরুন স্বতন্ত্র দুই জাতির মধ্যে গণ্য হতে পারে এবং দুই নিঃসম্পর্ক ও অপরিচিত ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার কারণে এক জাতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।”
“জন্মভূমির পার্থক্যও এ উভয় জাতির মধ্যে ব্যবধানের কারণ হতে পারে না। এখানে পার্থক্য করা হয় হক ও বাতিলের ভিত্তিতে। আর হক ও বাতিলের ‘স্বদেশ’ বা ‘জন্মভূমি’ বলতে কিছু নেই। একই শহর, একই মহল্লা এ একই ঘরের দুই ব্যক্তির জাতীয়তা ইসলাম ও কুফরের পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন হতে পারে। একজন নিগ্রো ইসলামের সূত্রে একজন মরক্কোবাসীর ভাই হতে পারে।”
“বর্ণের পার্থক্যও এখানে জাতীয় পার্থক্যের কারণে নয়। বাহ্যিক চেহারার রং ইসলামে নগন্য। এখানে একমাত্র আল্লাহর রঙেরই গুরুত্ব রয়েছে। তা-ই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম রং।”
১৯৪৪ সালের দিকে কংগ্রেস যখন বুঝতে পারল আজ হোক বা কাল পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা অবশ্যম্ভবী, তখন তারা মহাত্মা গান্ধীর মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনকে স্তিমিত করার প্রচেষ্টা চালালো। ১৯৪৪ সালে রাজা গোপালচারিয়ার মধ্যস্থতায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মহাত্মা গান্ধীর মধ্যকার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনড় মনোবল,অসীম দৃঢ়তা এবং ১৯০ বছর ধরে নির্যাতিত মুসলমানদের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষহীনতার কারণে কংগ্রেসের এই পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়। কায়েদে আজমকে কমন (India-Pakistan)গভর্নর জেনারেল হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু নির্যাতিত মুসলমানদের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষহীন জিন্নাহ ঘৃণাভরে এই সকল প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করে। মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে তিনি ছিলেন অবিচল।
৪৬ এর নির্বাচন মুসলিম লীগ এবং ভারতের মুসলমানদের জন্য ছিল 'ডু অর ডাই ম্যাচ'। এই নির্বাচনে মুসলিম লীগ এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের প্রতি সমগ্র ভারতের মুসলমানদের আকুণ্ঠ সমর্থন পাকিস্তান আন্দোলনকে চূড়ান্ত সফলতা দান করে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ সারা ভারতবর্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় চষে বেড়ান এবং সারা ভারতের মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি জনমত সৃষ্টি করেন এবং ঐক্যবদ্ধ করেন। সারা ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মুসলমানরা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের নিকট চিঠি লিখতো এবং তাদের সমর্থন ব্যক্ত করতো। ৪৬ এর নির্বাচনে সমগ্র ভারতে মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনসমূহে ভূমিধস বিজয় পায়। মধ্যপ্রদেশ,আসাম, বিহার সহ অনেক প্রদেশে (যেগুলো পাকিস্তানের মধ্যে আসার কথা নয়) মুসলিম লীগ মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনে 'ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টোরি' অর্জন করে।
ভারতের এই সংখ্যালঘু মুসলমান ভাইদের নির্ভীক মনোভাব ও অসীম ত্যাগে আমরা পেয়েছিলাম মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি। কিন্তু আমাদের সেই মজলুম ভাইদের এর বিনিময়ে দিতে হয়েছিল চরম মূল্য। ৪৬ এর নির্বাচনে বিজয়ের ফলে মুসলিম লীগ পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশগ্রহণ করে এবং নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একাই বিভিন্ন ফ্রন্টে একই সময়ে লড়াই করেছিলেন। কংগ্রেস যেখানে শুধুমাত্র ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল সেখানে জিন্নাহ কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা, ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে একই সময়ে লড়তে হয়েছিল। কিন্তু একটা লড়াইয়ের কথা অনেকেরই অজানা আর তা হলো জিন্নাহকে সময়ের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছিল। তিনি টিবি'র রোগী ছিলেন এবং তার ব্যক্তিগত পার্সিয়ান ডাক্তার তাকে বলেছিলেন 'আপনি সর্বোচ্চ দুই বছর বাঁচবেন'। কিন্তু এত কিছুর পরেও মুসলমানদের নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কখনো 'নীতির প্রশ্নে' আপোষ করেননি।
১৯৪৭ সালের সারা গ্রীষ্মকাল ব্যাপী দিল্লিতে দেশভাগের প্রস্ততি অব্যাহত থাকে। সম্পদ ভাগ, সীমান্ত চিহ্নিত করার জন্য সীমানা কমিশন গঠন এবং ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীর অপসারণ সম্পন্ন হয়। সামরিক বাহিনী দুটি বাহিনীতে পুনর্গঠিত হয়।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট। হিজরী হিসেবে পবিত্র রমজান তখন চলমান। এই মাসের ২৭ তারিখ পবিত্র রজনীতে নতুন করে লেখা হলো মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস। ১৩ ই আগষ্ট বৃটিশ ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন করাচী যান এবং ১৪ আগস্টের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানের গণপরিষদের বিশেষ অধিবেশনে পাকিস্তানের গভর্নর কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নিকট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ গ্রহণের পর জিন্নাহ জাতির উদ্দেশ্য ইংরেজীতে ভাষণ দেন রাত ১২টায়।...এই ভাষণ শুনার জন্য তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সলিমুল্লাহ মুসলিম হল মিলনায়তনে ছুটে আসে। PBS (পাকিস্তান ব্রডকাস্টিং সার্ভিস) থেকে সরাসরি ভাষণটি শুনানো হয়েছিল।
১৪ ই আগস্টের আলো-আঁধারির মধ্যে হয়তোবা কেউ ঘুম থেকে উঠে দু রাকাত সলাত পড়ে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছিল। ১৯০ বছরের যে কালো মেঘ মুসলমানদের জীবনকে গ্রাস করে ধ্বংসের অতল গহ্বরে এনে দাঁড় করিয়ে ছিল, আল্লাহ সেই অবস্থা থেকে তাদের মুক্তি দিয়েছেন। যে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিংস্রতার জাতাঁকল উপমহাদেশের মুসলমানদের কুরে কুরে শেষ করে দেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিল। একইসাথে তার থেকেও মিললো মুক্তি। এজন্যই এটি ছিলো এক নতুন যুগ ও সময়ের অভিযাত্রা।