বেঙ্গল ডেল্টা এলাকায় ঠিক কত বছর আগে জনবসতি শুরু হয়েছে, এ ব্যাপারে এখনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক পুরান ঢাকার কারাগার খুঁড়ে প্রায় ২৫০০ বছরের পুরনো নিদর্শন খুঁজে পান। নরসিংদীর উয়ারী–বটেশ্বরে প্রতিরক্ষা প্রাচীর ও পরিখা, পাঞ্চ-মার্কড মুদ্রা, মূল্যবান পাথরের পুঁতি, লৌহবস্তু, উন্নত মৃৎপাত্র এবং কারুশিল্পের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যার বয়স প্রায় তিন হাজার বছর। লিখিত ইতিহাসে এই অঞ্চল সম্পর্কে প্রথম কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য পাওয়া যায় প্রথম শতাব্দীর দিকে কয়েকজন গ্রিক এবং রোমান লেখকের লেখায়। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ তিনজনের আলোচনা উল্লেখ্য:
১. দিওদোরাস সিকুলাস
বাংলা অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে প্রথম সুস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায় গ্রিক ইতিহাসবেত্তা দিওদোরাস সিকুলাসের লেখায়। খ্রিস্টপূর্ব ১ম শতকে রচিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'বিবলিওথেকা হিস্টোরিকা' (Bibliotheca historica)-তে ‘গঙ্গারিডাই’ (Gangaridai) নামে এক শক্তিশালী জাতি ও রাজ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। দিওদোরাসের ভাষায়:
“গঙ্গা নদী উত্তর থেকে দক্ষিণ অভিমুখে প্রবাহিত হয়ে গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্ব সীমান্ত ছুঁয়ে সমুদ্রে পতিত হয়েছে।”
উল্লেখ্য, দিওদোরাস নিজে এই অঞ্চলে সরাসরি আগমন করেননি। তিনি মূলত গ্রিক পর্যটক ও মৌর্য রাজসভার বিখ্যাত মেসিডোনীয় দূত মেগাস্থিনিস রচিত ‘ইন্ডিকা’ এবং অন্যান্য প্রাচীন নথির ওপর ভিত্তি করে এই বিবরণ সংকলন করেন। মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থেই গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের প্রথম লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়; তবে মূল বইটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেলেও দিওদোরাসের মতো পরবর্তী লেখকদের উদ্ধৃতিতেই সেই অমূল্য ইতিহাস আজ অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
সামরিক শক্তি
দিওদোরাসের বর্ণনা মতে, গঙ্গারিডাইদের এক বিশাল ও সুসংগঠিত বাহিনী ছিল। তাদের সামরিক বহরে ছিল প্রায় ২ লক্ষ পদাতিক, ২০ হাজার অশ্বারোহী, ২ হাজার রথ এবং ৩-৪ হাজার সুশিক্ষিত রণহস্তী।
এই বিপুল হস্তিবাহিনীই ছিল তাদের মূল শক্তি। প্রাচীন বিশ্বে যুদ্ধহস্তী ছিল “ট্যাঙ্ক”-এর সমতুল্য এক ভীতিকর অস্ত্র। ইতিহাসবিদদের মতে, এই শক্তির কারণেই কোনো বিদেশি শক্তি সহজে এই অঞ্চল আক্রমণের সাহস পায়নি।
আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তন
আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে দক্ষিণ এশিয়া অভিযানে আসেন। তিনি বিপাশা (বর্তমান বিয়াস) নদীর তীরে পৌঁছালে, পদ্মার ওপারে এই শক্তিশালী রাজ্যের প্রস্তুতির কথা শুনে তাঁর সেনাবাহিনী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি এবং গঙ্গারিডাইদের অপরাজেয় হস্তিবাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে গ্রিক সৈন্যরা আর সামনে এগোতে অস্বীকৃতি জানায় (cf. Diodorus II.37; Curtius Rufus IX.2)।
দিওদোরাসের মতে, গঙ্গারিডাইদের সামরিক প্রস্তুতির খবর পেয়ে আলেকজান্ডার বুঝতে পারেন—এই অঞ্চল জয় করা সহজ হবে না।
গঙ্গা নদী ও প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা
দিওদোরাস গঙ্গা নদী সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, গঙ্গা নদী ছিল এই অঞ্চলের পূর্ব সীমান্তে, নদীটির প্রস্থ ছিল প্রায় ৩০ স্টাডিয়া (প্রায় ৫–৬ কিলোমিটার), যা তৎকালীন গ্রিকদের কাছে অবিশ্বাস্যরকম বিশাল।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, “গঙ্গারিডাই জাতি কখনো কোনো বিদেশি শক্তির অধীনতা স্বীকার করেনি।”
এখানে শুধু সামরিক শক্তিই নয়, বরং প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা—বিশাল নদী, জলাভূমি ও ঘন বনভূমিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন।
২. প্লিনি দ্য এল্ডার
প্রথম শতকে রোমান পণ্ডিত প্লিনি দ্য এল্ডার তাঁর বিশ্বকোষ 'ন্যাচারালিস হিস্টোরিয়া' (Naturalis Historia)-তে এই ‘গঙ্গারিস’ (Gangarides) জাতির কথা পুনরায় উল্লেখ করেন (Pliny, NH, VI.66)। প্লিনিও এই অঞ্চলে আসেননি, মূলত গ্রিক লেখক ও রোমান বণিকদের তথ্যের সমন্বয়ে এই বিবরণ দেন। তাঁর লেখায় দুটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়:
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য: গঙ্গা নদী ও মোহনা অঞ্চলে অসংখ্য দ্বীপ ছিল। এই দ্বীপগুলোর মধ্যে বৃহত্তম ও শক্তিশালী অঞ্চলটি গঙ্গারিডাইদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
সামরিক শক্তি: ৬০,০০০ পদাতিক, ১,০০০ অশ্বারোহী এবং ৭০০ রণহস্তী।
যদিও এই সংখ্যা দিওদোরাসের তুলনায় কম, তবে উভয় বিবরণেই হস্তিবাহিনীর গুরুত্ব স্পষ্ট।
৩. ক্লডিয়াস টলেমি
দ্বিতীয় খ্রিস্টাব্দের বিখ্যাত ভূগোলবিদ ক্লডিয়াস টলেমি গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে বেশ বিস্তারিত তথ্য রেখে গেছেন। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, গঙ্গা নদীর প্রধান পাঁচটি শাখা ও নদীমুখ সংলগ্ন উপকূলীয় পুরো অঞ্চলটিই ছিল গঙ্গারিডাইদের নিয়ন্ত্রণে, আর এই সমৃদ্ধ রাজ্যের রাজধানী ছিল ‘গাঙ্গে’ (Gange) নামক ঐতিহাসিক নগরী।
টলেমির প্রদত্ত মানচিত্রে বঙ্গোপসাগর উপকূলের সবচেয়ে পশ্চিম থেকে শুরু করে সবচেয়ে পূর্বের নদীমুখ পর্যন্ত চারটি সুনির্দিষ্ট দ্রাঘিমাংশ দেওয়া আছে। আধুনিক ভূ-উপগ্রহ ও কার্টোগ্রাফিক বিশ্লেষণে দেখা যায়:
পশ্চিম সীমা: ভাগীরথী নদীর মোহনা (বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের তমলুক / মেদিনীপুর অঞ্চল)।
পূর্ব সীমা: পদ্মা ও মেঘনার যৌথ অববাহিকার প্রাচীন মোহনা (বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম সংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চল)।
এই দুই সীমানার মধ্যকার দ্রাঘিমাংশের ব্যবধান টলেমির ২,০০০ বছর আগের হিসাবের সাথে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। অর্থাৎ, প্রাচীন গঙ্গারিডাই সাম্রাজ্য বলতে গঙ্গার দুই প্রধান প্রবাহ—ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বর্তমান বাংলাদেশকে চিহ্নিত করা যায়।
অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বস্ত্রের খ্যাতি
গঙ্গারিডাই শুধু সামরিক শক্তির জন্যই নয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যও সুপরিচিত ছিল। এই অঞ্চলের সূক্ষ্ম বস্ত্র গ্রিক ও রোমান অভিজাতদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। প্লিনি দ্য এল্ডার রোমান অভিজাতদের এই অঞ্চলের সূক্ষ্ম বস্ত্রপ্রীতির সমালোচনা করেছিলেন। বস্ত্রের পাশাপাশি গঙ্গারিডাই থেকে রত্ন, মুক্তা, প্রবাল, মসলা ও বিলাসপণ্য রোমান সাম্রাজ্যসহ দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানি হতো।
খ্রিস্টীয় প্রথম বা দ্বিতীয় শতকের পর গঙ্গারিডাই নামটি ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে থাকে। এর কারণ ছিল বহুবিধ:
প্রাকৃতিক কারণ: গঙ্গারিডাই-এর মূল শক্তি ছিল এর নৌ-বন্দর। প্রাকৃতিক কারণেই বন্দরগুলো অকেজো হয়ে যায়। পলি জমে নদীর মোহনাগুলো অগভীর হয়ে যাওয়ায় বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ আর ভিড়তে পারত না। এছাড়া হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলো বারবার গতিপথ পরিবর্তন করায় তৎকালীন সমৃদ্ধ নগরীগুলো নদী থেকে দূরে সরে যায়।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তন: খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকের পর রোমান সাম্রাজ্যের সাথে উপমহাদেশের সরাসরি সমুদ্র বাণিজ্যে কিছুটা ভাটা পড়ে। পদ্মা অববাহিকার বন্দরগুলোর পরিবর্তে দক্ষিণ ভারতের বন্দরগুলো (যেমন: মুজিরিস) বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক কারণ: গঙ্গারিডাই নামটির বিলুপ্তির আরেকটি বড় কারণ ছিল মৌর্য এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান। এলাহাবাদ প্রশস্তি শিলালিপিতে 'সমতট' এবং 'ডবাক' নামক জনপদের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা সম্ভবত প্রাচীন গঙ্গারিডাই-এরই উত্তরসূরি।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অভাব কেন?
প্রশ্ন হলো, যদি এত সমৃদ্ধ জনপদ থেকে থাকে, তবে তার নিদর্শন কোথায় গেল?
এই নিদর্শন না পাওয়ার কারণও প্রাকৃতিক। বাংলার মাটি মূলত পলিমাটি। উত্তর ভারতের পাথুরে অঞ্চলের মতো এখানে শিলালিপি বা স্থায়ী স্থাপত্য টিকে থাকা কঠিন ছিল। অধিকাংশ নগরী কাঠ এবং পোড়ামাটি দিয়ে তৈরি হওয়ায় সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা, ভূমিকম্প) বা নদীভাঙনে মাটির নিচে চাপা পড়ে গেছে। আবুল মনসুর আহমদ ব্যাখ্যা করেছেন:
‘তারা মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার মতো সুন্দর নগরী পাক-বাংলায় নিশ্চয়ই নির্মাণ করিয়াছিলেন। অবশ্য স্থানীয় নির্মাণ উপকরণের পার্থক্যে স্থাপত্যেও নিশ্চয় পার্থক্য ছিল। কিন্তু আজ সে সবের কোনো চিহ্ন নাই। প্রাকৃতিক কারণে পাক-বাংলায় চিরস্থায়ী প্রাসাদ-দুর্গ-অট্টালিকা নির্মাণের উপযোগী মালমসলা যেমন দুষ্প্রাপ্য, নির্মিত দালানকোঠা ইমারত রক্ষা করাও তেমনি কঠিন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের এরা নিশ্চিত শিকার। ময়নামতি, মহাস্থানগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখিয়া পাক-বাংলার সভ্যতার প্রাচীনত্ব ও স্থপতির চমৎকারিত্ব আন্দাজ করা যায় মাত্র, বিচার করা যায় না।’
গ্রিক শব্দ গঙ্গারিডাই, কিন্তু এই অঞ্চলের ভাষায় শব্দটা কী ছিল, সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। কিছু ভাষাবিজ্ঞানী মত দিয়েছেন, শব্দটা সম্ভবত ‘গঙ্গারিদ্ধি’ বা এজাতীয় কিছু।
আর্যদের আগমন
আর্যদের আগমন উপমহাদেশের ইতিহাসে একটি বড় ঘটনা। তারা ছিল যাযাবর জাতি, ঘোড়াকে তারাই প্রথম পোষ মানায়। তারা ছিল যুদ্ধবাজ ও নিষ্ঠুর। আর্যরা দ্রাবিড়প্রধান পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর ভারত খুব সহজেই দখল করে নেয়। সামরিক বিজয়ের সাথে সাথে তারা তাদের বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতি এ এলাকার মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়। তাদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে এ সব এলাকার দ্রাবিড়রা দক্ষিণ ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
প্রায় সমগ্র উত্তর ভারত তাদের করতলে চলে যায়। কিন্তু এই বঙ্গ অঞ্চলের মানুষ আর্যদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এর ফলে করতোয়া নদীর তীরে এসে আর্যদের জয়রথ থেমে যায়। এ লড়াইয়ের ব্যাপারে অধ্যাপক মন্মথমোহন বসু লিখেছেন:
‘প্রায় সমস্ত উত্তর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সগর্বে মস্তক উত্তোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ বলেন, আর্যদের হোমাগ্নি সরস্বতীর তীর হইতে ভাগলপুরের সাদানিরার (করতোয়া নদীর) পশ্চিম তীর পর্যন্ত আসিয়া থামিয়া যায়। অর্থাৎ সাদানিরার অপর পারে অবস্থিত বঙ্গদেশে তাহারা প্রবেশ করিতে পারেন নাই।’
মুখোমুখি সমরে না পেরে আর্যরা ভিন্ন পথ ধরে। তারা ধর্ম প্রচারের জন্য ব্রাহ্মণদের পাঠায় এবং সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক দিয়ে একটি সমঝোতা করার চেষ্টা করে। ‘চার স্তরে বিভক্ত আর্য সমাজের ক্ষত্রিয়, বৈশ্য বা শূদ্র প্রথমে বাংলায় আসেনি। এদেশে প্রথমে এসেছে ব্রাহ্মণরা বেদান্ত প্রচারের নামে’। লড়াই শুরু হয় দুই দিক থেকে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা চলে।
আর্যদের সাহিত্যে দেব ও অসুরদের যে যুদ্ধের কাহিনি আছে, তা মূলত এই অঞ্চলের মানুষ ও আর্যদের সংঘাতের কাহিনি। উইলিয়াম হান্টার তাঁর Annals of Rural Bengal এ প্রসঙ্গে লিখেছেন:
“সংস্কৃত সাহিত্যে বিদ্যামান প্রথম ঐতিহাসিক ঘটনা হলো আর্য অধিবাসীদের সঙ্গে আদিবাসীদের বিবাদ। এই বিবাদজনিত ইতিহাস ছড়িয়ে রয়েছে খণ্ডিত ভক্তগাথা, ধর্মশাস্ত্রের অনুল্লেখ এবং মহাকাব্যের কিংবদন্তিতে। যুগ যুগ ধরে সংস্কৃত প্রথা আদিবাসীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকার হতে বঞ্চিত করে তাদের স্বতন্ত্র ও দূরে রেখেছে।”
আর্যদের সাথে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় লড়াইয়ের ফলে বাংলাদেশের মানুষ নিরাকার একেশ্বরবাদী ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে জৈন এবং পরে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে। এ ব্যাপারে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘বাঙলার ইতিহাস’ বইয়ে বলেন:
‘আর্যরাজগণের অধঃপতনের পূর্বে উত্তরাপথের পূর্বাঞ্চলে আর্য ধর্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন উপস্থিত হইয়াছিল। জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম এই আন্দোলনের ফলাফল।’
পাল শাসন: ইতিহাসের সোনালী সময়
প্রথমে মৌর্য সাম্রাজ্য এবং পরে গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসকেরা বাংলার এই অঞ্চলগুলোর অনেকখানি নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আর যেসব জনপদ সরাসরি তাদের অধীনে ছিল না, তারাও এই বড় সাম্রাজ্যগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বা মিত্রতা বজায় রাখত। মৌর্য সাম্রাজ্যের আমলে আর্যরা এদেশে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। গুপ্ত আমলে তা আরও বৃদ্ধি পায়।
৬৩৭ সালে গৌড়ের রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে এক ঘোরতর নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়, যা প্রায় দেড়শো বছর স্থায়ী ছিল। একে মাৎস্যন্যায় যুগ বলা হয়।
এই সময় বাংলায় বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃষ্টি হয় এবং আত্মকলহ, গৃহযুদ্ধ, গুপ্তহত্যা ও অত্যাচার চরমে ওঠে। বাংলার এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে আর্যরা এ অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ সময় বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে হিন্দুদের প্রভাবে তান্ত্রিকতা ও মূর্তি পূজা প্রবেশ করে এবং বৌদ্ধরা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়:
১. হীনযান
২. মহাযান
মহাযানপন্থীরা হিন্দুদের প্রভাবে তান্ত্রিকতা ও বৌদ্ধ মূর্তি পূজা শুরু করে, আর হীনযানপন্থীরা এর বিরোধী ছিল।
তবে মাৎস্যন্যায়ের সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এই অঞ্চলে আসতো। এই সময়ে আরব থেকে মুসলমান ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ীদের সাথে দরবেশ, সুফি, পীরেরা এই অঞ্চলে আসা শুরু করেন। চট্টগ্রাম হয়ে পুরো অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পরে। অরাজকতায় অতিষ্ঠ মানুষ ইসলামের সাম্যের বানী গ্রহন শুরু করে। ৬৮৯ সালে লালমনিরহাট জেলার লালমনিরহাট সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম মসজিদ স্থাপিত হয়। এখানে পাওয়া একটি শিলালিপিতে আরবিতে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' এবং হিজরি ৬৯ সাল খোদিত রয়েছে। ঐতিহাসিকদের ধারণা অনুযায়ী, সাহাবি হজরত আবু ওয়াক্কাস (রা.) বা তাঁর সঙ্গীদের কারো মাধ্যমে এটি নির্মিত হতে পারে।
আনুমানিক ৭৫০ সালে এই অঞ্চলের মানুষ এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নেন। দেশের সব স্তরের মানুষ মিলে কোনো রক্তপাত ছাড়াই গোপাল নামক এক যোগ্য সামরিক নায়ককে বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচন করেন।
গোপালের এই নির্বাচনের মাধ্যমেই অবসান ঘটে দীর্ঘ 'মাৎস্যন্যায়' যুগের এবং সূচনা হয় বাংলার গৌরবময় পাল রাজবংশের, যারা পরবর্তী প্রায় ৪০০ বছর বাংলা শাসন করেছিল।
পাল রাজবংশের উত্থান
পাল বংশ প্রায় ৪০০ বছর বাংলা শাসন করে, যা বাংলার ইতিহাসের অন্যতম সোনালী সময়। এ সময় এই অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার গড়ে ওঠে, যা ছিল আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অতীশ দীপংকর এবং বিখ্যাত শিক্ষাবিদ জেতারীর বিশ্ববিদ্যালয় এ সময়েই বরেন্দ্র অঞ্চলে গড়ে ওঠে। হিউয়েন সাং-এর শিক্ষক শীলভদ্রও এ সময় জ্ঞানচর্চা করেন।
পরে তান্ত্রিকতা ও বৌদ্ধ মূর্তি পূজারি মহাযানপন্থীদের মধ্যে আবার বিভক্তি দেখা দেয়:
১. কালচক্রযান
২. বজ্রযান
বজ্রযান শাখার মধ্যেই সহজিয়া মতবাদের উদ্ভব হয়, যারা তান্ত্রিকতা ও বৌদ্ধ মূর্তি পূজারি মহাযানপন্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই সহজিয়া সম্প্রদায়ই সবচেয়ে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য ‘চর্যাপদ’ রচনা করে।
এ সময় আর্য-ব্রাহ্মণ শাসিত পশ্চিম ভারত সুলতান মাহমুদের অভিযানে নাকাল থাকায় তারা সামরিকভাবে বাংলায় কোনো অনিষ্ট করার সুযোগ পায়নি। তবে ব্রাহ্মণরা এ সময় তাদের প্রভাব বাড়াতে ‘Assimilation’ (আত্মীকরণ) তত্ত্বের আশ্রয় নেয় এবং বিভিন্ন রাজ পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে। ড. নীহাররঞ্জন রায় তাঁর বইতে উল্লেখ করেছেন:
‘পাল রাজাদের অনেকেই ব্রাহ্মণ রাজ পরিবারের মেয়ে বিয়ািয়াছিলেন। ফলে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ ধর্মের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল।’
পরবর্তীতে পাল রাজারা অনেকেই ব্রাহ্মণ্যবাদ ও তাদের মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে দশম শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মে পুরোহিততন্ত্রের প্রভাব দেখা দেয়। নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়:
“এই মিল-সমন্বয় সত্ত্বেও বৌদ্ধ ধর্ম তার দেবায়তনে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কৃষ্টিগত হইয়া পড়িয়াছিল। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বাহ্য ব্যবধান ঘুচিয়া যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি আকর্ষণ বৃদ্ধি পাইয়াছিল।”
এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রভাব অন্যান্য ক্ষেত্রেও পড়ে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়, আর এই বিদ্রোহের সুযোগ নিয়ে বিজয়সেন পশ্চিমবঙ্গে ক্রমশ আধিপত্য বিস্তার করেন।
সেন শাসন: ইতিহাসের ঘোর দুর্দিন
১০৯৭ সালে বিজয়সেনের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলার ইতিহাসের ঘোর দুর্দিন—সেন শাসন। এদের বর্ণনা দিয়ে সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন:
“কর্নাটক থেকে বহিরাগত সেনরা এসে যখন এদেশকে অধিকার করল, তখন তারা একটি নিষ্ঠুর শোষণ-কার্যের মধ্য দিয়ে এদেশবাসীকে নির্যাতন করতে লাগল। তারা সংস্কৃতিকে নিয়ে এল রাজসভার মধ্যে এবং মন্দিরের অভ্যন্তরে। পাল আমলে বাংলা ভাষা ক্রমশ রূপলাভ করছিল। সরহপা পূর্বী অপভ্রংশে তাঁর দোঁহাকোষ রচনা করেছিলেন। সেনরা এসে সংস্কৃতিকে প্রশাসনিক ভাষা হিসাবে গ্রহণ করেন এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভাষাও সংস্কৃতকে গ্রহণ করেন। তার ফলে এদেশের মানুষের নিজস্ব উচ্চারণের ভাষা সরকারি আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। আমরা লক্ষ্য করি যে, সেনদের আমলে দেশীয় ভাষায় চর্চা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ ছিল। সেনরা যে সংস্কৃতি নিয়ে এল, সে সংস্কৃতি ছিল হিন্দুদের এবং তাও সকল শ্রেণীর হিন্দুর নয়, তা ছিল কৌলিন্যবাদী ব্রাহ্মণদের এবং অংশত ক্ষত্রিয়দের... এর ফলে এ অঞ্চলের সংস্কৃতি পরিপূর্ণভাবে বর্ণহিন্দুর অধিকারে চলে গেল।”
সেন রাজারা ছিলেন বৈষ্ণব মতবাদের কঠোর অনুসারী। এ সময় এই অঞ্চলে পাইকারি হারে বৌদ্ধদের হত্যা করা হয়, বর্ণপ্রথা কঠোর করা হয় এবং ছত্রিশ জাতের উৎপত্তি ঘটে। উৎপাদনের সাথে যত বেশি সম্পৃক্ত, সমাজে তাদের স্থান হলো তত নিচে; আর উৎপাদনবিমুখ ও পরজীবী শ্রেণির মর্যাদা হলো তত ওপরে।
ব্রাহ্মন্যবাদী সেন রাজাদের অত্যাচারে প্রায় এক কোটি বৌদ্ধ নিহত হয়। যারা বেঁচে ছিল, তারা নেপাল, মঙ্গোলিয়া, বার্মা ও কম্বোডিয়ায় পালিয়ে যায়। প্রাচীনতম বাংলা সাহিত্য ‘চর্যাপদ’ নেপালে পাওয়া যাওয়ার কারণ হলো সহজিয়া সম্প্রদায় সেন রাজাদের অত্যাচারে সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল। এই হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে ড. দীনেশচন্দ্র সেন Discovery of Living Buddhism in Bengal বই থেকে উল্লেখ করেন:
‘যে জনপদে (পূর্ববঙ্গে) এক কোটিরও অধিক বৌদ্ধ ছিল এবং ১৫৫০ ঘর ভিক্ষু বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই।’
ইসলামের আগমন ও বিস্তার
এই সময়ে মজলুম মানুষের পাশে এসে দাঁড়ান মুসলমান সূফি, দরবেশ ও আলেমেরা। এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারকরা প্রথম কবে আসেন, তা নিয়ে একাধিক মত আছে। ষষ্ঠ শতাব্দীতেই এই অঞ্চলে সূফিদের আগমন শুরু হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রাপ্ত শিলালিপি অনুসারে ৬৯০ সালে বর্তমান লালমনিরহাট জেলায় এই অঞ্চলের প্রথম মসজিদ স্থাপিত হয়।
রাজশাহীর পাহাড়পুরে বৌদ্ধবিহার খননকালে দুটি আরবি মুদ্রা পাওয়া যায়, যা ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে অর্থাৎ আব্বাসীয় খলিফা হারুন উর-রশীদের আমলে তৈরি হয়েছিল। পাল আমলে বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। ৯১৫ থেকে ৯১৬ সালের মধ্যে আরব ভূগোলবিদ আল-মাসুদী সমতট অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং তাঁর বিখ্যাত মুরুজুজ জাহাব (The Meadows of Gold) গ্রন্থে এই অঞ্চলে সমৃদ্ধ মুসলমান বসতির কথা উল্লেখ করেছেন।
সেনদের আমলে ইসলামের প্রসার আরও বৃদ্ধি পায়। সেন-ব্রাহ্মণ যুগের সামাজিক, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও অর্থনৈতিক শোষণে মানুষের জীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন ইসলাম প্রচারক আলেম ও সূফিরা নিপীড়িতদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠেন। সেনরা কৃত্রিম বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল, আর ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের বাণী ছিল তার বিরুদ্ধে প্রবল এক প্রতিবাদ। তেরো শতকের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি বিশিষ্ট শহর ও বন্দরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। সূফিদের গড়ে তোলা মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাহগুলো হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র, শিক্ষার কেন্দ্র এবং মুক্তির সংগ্রামের ঘাঁটি।
তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি
১. Diodorus Siculus. Bibliotheca Historica, Book II, Chapter 37 (Section 2–3) & Book XVII, Chapter 93.
২. Pliny the Elder. Naturalis Historia (Natural History), Book VI, Chapter 22 (Section 65–68).
৩. Ptolemy, Claudius. Geographia, Book VII, Chapter 1, Section 73–81 (Gangaridai / Ganges Delta).
৪. Majumdar, R. C. (Ed.). (1943). The History of Bengal, Vol. I: Hindu Period. Dhaka: University of Dacca, pp. 34–42, 185–190.
৫. রায়, নীহাররঞ্জন। (১৪০২ বঙ্গাব্দ)। বাঙলার ইতিহাস: আদিপর্ব। কলকাতা: দে'জ পাবলিশিং, পৃষ্ঠা: ১৩৯, ১৫১, ৫৪৭–৫৫২।
৬. Chakrabarti, Dilip K. (2001). Archaeological Geography of the Ganga Plain: The Lower and the Middle Ganga. New Delhi: Permanent Black, pp. 210–225.
৭. Rahman, S. M. Sufakhrul. (2012). Wari-Bateshwar: An Early Historic Trading Centre. Dhaka: International Centre for Study of Bengal Art, pp. 45–68.
৮. মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল। (২০০৩)। আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা। ঢাকা: প্রীতি প্রকাশন, পৃষ্ঠা: ২৩, ২৫, ১০৪–১০৫।
৯. আহসান, সৈয়দ আলী। (২০০৩)। (মুখবন্ধ) আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা (রচয়িতা: মোহাম্মদ আবদুল মান্নান)। ঢাকা: প্রীতি প্রকাশন, পৃষ্ঠা: ৭–১০।
১০. সেন, ড. দীনেশচন্দ্র। (১৯২০)। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান। কলকাতা: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা, পৃষ্ঠা: ১০–১১।
১১. Al-Masudi. (1841). Historical Encyclopaedia entitled "Meadows of Gold and Mines of Gems" (Trans. Aloys Sprenger), Vol. 1. London: Oriental Translation Fund of Great Britain and Ireland, pp. 170–190.
১২. Al Jazeera English. (2012, August 18). "Ancient mosque unearthed in Bangladesh". [News Article Report].