هذا الموقع قيد الإنشاء
আজাদী আন্দোলন
Azadi Movement

১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ছিল বাংলার ইতিহাসে পরাধীনতার সুচনা বিন্দু, যার মূল প্রোথিত ছিল শতবর্ষ আগের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিবর্তনে। ইউরোপীয়রা ১৬শ শতাব্দীতে প্রথম বাংলায় আসতে শুরু করে। পর্তুগিজদের হাত ধরে এই যাত্রার সূচনা হয় এবং পরবর্তীতে ওলন্দাজ (ডাচ), ফরাসি এবং সবশেষে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে আসে, যারা ধীরে ধীরে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। বাংলার বস্ত্রশিল্প, শোরা এবং অন্যান্য পণ্যের প্রাচুর্য তাদের আকৃষ্ট করেছিল। ইংরেজ কোম্পানি কাসিমবাজার ও কলকাতার মতো স্থানগুলোতে তাদের বাণিজ্যিক কুঠি স্থাপন করে।

মুঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে ইংরেজরা বাংলায় বাণিজ্যের অনুমতি পাওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ১৬৯০ সালে কলকাতা, গোবিন্দপুর ও সুতানুটি গ্রাম ক্রয়ের মাধ্যমে তারা তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে 'ফোর্ট উইলিয়াম' দুর্গ গড়ে তোলে। ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলী খানের মাধ্যমে স্বাধীন নবাবী শাসনের সূচনা হলে দিল্লির কেন্দ্রীয় শক্তির সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটে, যার ফলে নবাবগণ দেশীয় হিন্দু অভিজাত ও বণিক শ্রেণির ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে হিন্দুদের পদায়ন এবং ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁদের উত্থান ক্ষমতা কাঠামোতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করে। নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে পারিবারিক কোন্দল এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সময়ের সাথে সাথে কোম্পানি বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করে। তারা জগৎ শেঠদের মতো প্রভাবশালী হিন্দু বণিক পরিবারগুলোর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে, যারা মুনাফা ও নিরাপত্তার বিনিময়ে কোম্পানিকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করত। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে এই জোটগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। মীর জাফর, রায় দুর্লভ এবং উমিচাঁদের মতো ব্যক্তিরা ব্রিটিশদের সাথে এই চক্রান্তে লিপ্ত হন।

সিরাজউদ্দৌলা ক্ষমতায় বসার পূর্বেই দরবারে একটি শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, যারা নবাবের চেয়ে নিজেদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক লাভকে প্রাধান্য দিত। জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ এবং উমিচাঁদ ছিলেন এই ষড়যন্ত্রের প্রধান কুশীলব। তাঁরা রবার্ট ক্লাইভের সাথে হাত মিলিয়ে প্রধান সেনাপতি মীর জাফরকে নবাবের গদির লোভ দেখিয়ে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ করেন। জগৎশেঠের বাড়িতেই চূড়ান্ত হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা বিক্রির এই নীলনকশা। ফলে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে কোনো প্রকৃত যুদ্ধ হয়নি, বরং মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় মঞ্চস্থ হয়েছিল এক চরম প্রহসন। সিরাজের পতনের পর মীর জাফরকে সিংহাসনে বসানো হলেও তিনি দ্রুতই বুঝতে পারেন যে, তিনি স্বাধীন শাসক নন বরং ইংরেজদের হাতের এক ক্ষমতাহীন ক্রীড়নক বা পুতুল ছাড়া আর কিছুই নন। এই পরাজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় প্রায় দুইশ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্ধকার যুগ শুরু হয়।

মীর জাফরের পর মীর কাসিম প্রাথমিকভাবে ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সমর্থনে ক্ষমতায় এলেও শীঘ্রই তাদের শোষণমূলক বাণিজ্যনীতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে বিরক্ত হয়ে ওঠেন। বাংলার স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিয়ে তিনি তাঁর সেনাবাহিনী পুনর্গঠন করেন, প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা করেন এবং কোম্পানির বিশেষ সুযোগ-সুবিধা খর্ব করার উদ্যোগ নেন। তাঁর এই প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্য যুদ্ধের রূপ নেয়। বাংলা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি ব্রিটিশ আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সাথে জোটবদ্ধ হন। ১৭৬৪ সালের ২২-২৩ অক্টোবর বিহারের বক্সারের কাছে এই সম্মিলিত বাহিনী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুখোমুখি হয়, যা 'বক্সারের যুদ্ধ' নামে পরিচিত।

মীর কাসিমদের সম্মিলিত বাহিনী সংখ্যাগত দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও, মেজর হেক্টর মুনরোর নেতৃত্বাধীন কোম্পানির সুশৃঙ্খল বাহিনীর কাছে এই জোট পরাজিত হয়। এই পরাজয়ের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী: ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার 'দেওয়ানি' (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করে, যা কার্যত পূর্ব ভারতে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মীর কাসিমের এই সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত সফল না হলেও, এটি ছিল ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শুরুর দিকের এক উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ এবং ভারতীয় শাসক ও কোম্পানির মধ্যে ক্রমবর্ধমান শক্তির ভারসাম্যহীনতার এক বহিঃপ্রকাশ।

বক্সারের যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলার দেওয়ানী তথা রাজস্ব সংগ্রহের পুর্ণ দায়িত্ব লাভ করে। এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক শোষণের যাত্রা শুরু হয়। শাসন ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয়। খরা ও উচ্চ করের সম্মিলিত চাপে বাংলায় দেখা দেয় মহা দুর্ভিক্ষ - ছিয়াত্তরের মন্বান্তর। এক তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়।

ইংরেজরা এই অঞ্চলের ক্ষমতা দখল করলেও এই অঞ্চল সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ছিল শূন্যের কোঠায়। অজ্ঞতা এবং অর্থের লোভ দেশে অরাজকতা তৈরী করে, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেয়। এইসব কারণে বিভিন্ন স্থানে তৈরী হয় বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাংলার লোকজনের বিশেষ করে মুসলমানদের স্বাধীনচেতা মনোভাব বারবারই ইংরেজদের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে মুসলমানদেরকে ধীরে ধীরে রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সহ সব কিছু থেকে বিতাড়ন ও পিছিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইংরেজরা। তারা মুসলমানদের বিদ্রোহী প্রজা হিসেবে সাব্যস্ত করেছিল। মুসলমান ও বিদ্রোহীদের শায়েস্তা করার এই কাজে তারা সহযোগী হিসেবে পেয়েছিল বর্ণ হিন্দু ব্যবসায়ী ও উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে।

আঠারো শতকের শেষের দিকে ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ছিল সাম্প্রদায়িক ঐক্যের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে মুসলিম ফকির এবং হিন্দু সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশদের নিপীড়নমূলক কর ব্যবস্থা ও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। এই আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য কম হলেও বৃটিশদের বিরুদ্ধে এটি ছিল প্রথম বিদ্রোহ। ফলে এই বিদ্রোহ বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের নিয়ামক হিসেবে পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা যুগিয়েছিল।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলায় মুসলমানদের সর্বশেষ অবলম্বনটুকু ধ্বংস করে ফেলা হয়। সকল জমিদারী হিন্দুদের হাতে চলে যায়, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে পড়ে এবং বাংলা পুরোপুরি ইংরেজ ও তাদের সহায়কদের করায়ত্তে চলে আসে। জমিদার, নায়েব, গোমস্তা, নীলকরদের অত্যাচার দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমতাবস্তায় এইসব অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার, জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন মুসলমানেরা।

উনিশ শতকের অগ্রগতির সাথে সাথে প্রতিরোধ আরও সামরিক রূপ ধারণ করে। উত্তর ভারতে সৈয়দ আহমদ শহীদ বেরলভীর নেতৃত্বে তারিকাহ-ই-মুহাম্মাদিয়া আন্দোলন ইসলামের শুদ্ধিকরণ এবং বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে মুসলিম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস চালায়। বালাকোটের এই আন্দোলনে বাংলার আপামর জনসাধারণ সাধ্যমতো অংশগ্রহণের প্রয়াস চালায়। মা-বোনেরা মুষ্টি চাল, গহনা, অর্থকড়ি মুজাহিদদের সহযোগিতায় উত্তর ভারতে পাঠাতেন। সামর্থবান যুবকেরা জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য উত্তর ভারতে গমন করতেন। বালাকোটের প্রান্তরে শহীদ হওয়ার পূর্বে সৈয়দ আহমদ শহীদ তার অধীনস্ত এলাকায় খেলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যম ন্যায় ও ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

বাংলায় তাঁর শিষ্য তিতুমীর এই চেতনার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি স্থানীয় কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে জমিদার ও ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান এবং চব্বিশ পরগণার নারকেলবেড়িয়ায় ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। তিতুমীরের নিয়ন্ত্রাধীন এলাকায়ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং সেখানে সকল ধর্ম-বর্ণের লোকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ফলে অনেক নিম্ন বর্ণের হিন্দু ও স্থানীয় খৃস্টান অত্যাচারী জমিদারদের বিরুদ্ধে তিতুমীরের আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের মুখে তিতুমীরের বাহিনী পরাজিত হয়, তবুও তিতুমীরের সংগ্রাম সাহস ও ব্রিটিশ বিরোধী চেতনার এক স্থায়ী প্রতীকে পরিণত হয়।

তিতুমীরের পর এই আন্দোলন হাজী শরিয়তুল্লাহর হাত ধরে বিস্তৃতি লাভ করে। প্রথমে ধর্মীয় আন্দোলন হলেও পরবর্তীতে তা সামাজিক ও রাজনোইতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। হাজী শরিয়তুল্লাহর পর দুদু মিয়া এই আন্দলনের হাল ধরেন। তিনি তার নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকায় পঞ্চায়েত ও গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। একই সাথে ইসলামী আইনের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য। নিরাপত্তার জন্য তিনি লাঠিয়াল বাহিনীও গঠন করেছিলেন। নিম্ন বর্গের হিন্দু এবং বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরাও দুদু মিয়ার কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছিল। এমনকি সবাই ন্যায় বিচারের আশায় দুদু মিয়ার কাছেই আসত। জনমানুষের এমন ভালবাসা ও খ্যাতির ফলে ইংরেজরা দুদু মিয়ায়র বিরুদ্ধে শক্তিশালী পদক্ষেপে ভয় পেতো।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে, যেখানে মুসলিম ও হিন্দু সৈন্য, কৃষক এবং অভিজাতরা ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেন। অস্তমান মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতের একমাত্র বৈধ শাসক আখ্যা দিয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের চেষ্টা করেছিলেন। মওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী সহ বিখ্যাত মুসলিম প্রায় সকল পণ্ডিত এই স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং সরাসরি এই লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা এই বিদ্রোহে অংশ নিলেও এর প্রধান দায়ভার মুসলমানদের উপর চাপানো হয়। এই বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল এবং মুঘল সম্রাট সহ মুসলিম নেতাদের নির্বাসন এবং অনেককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করে হয়েছিল। এর মাধ্যমে ভারতে মুসলিম শাসনের অবসান ও বৃটেনের রানীর শাসনের সূত্রপাত ঘটে।

১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে পরাজয়ের পর মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর যে ধরণের নির্যাতন-নিপীড়ন শুরু হয়েছিল তা স্বাধীনতা সংগ্রামের ধরণকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের দিকে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৮৬৬ সালে দেওবন্দ আন্দোলনের সূচনা হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ, যার লক্ষ্য ছিল ইসলামি শিক্ষা রক্ষা করা এবং পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিরোধ করা। এটি কেবল ধর্মীয় প্রচেষ্টা ছিল না, বরং এমন এক প্রজন্ম গড়ে তোলার কৌশল ছিল যারা আদর্শিকভাবে ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে।

একই সাথে উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং বাংলায় নওয়াব আব্দুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ মুসলমানদের শিক্ষাদীক্ষা এবং রাজনৈতিক সচেতনতার জন্যে কাজ শুরু করেন। তারা পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর উন্নতিকল্পে বৃটিশ সরকারের সাথে সহযোগিতা মূলক সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজগুলো তারা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।

বিশ শতকের শুরুর দিকে প্রতিরোধ আন্দোলনগুলো আরও আধুনিক ও সূক্ষ্ম বিপ্লবী পরিকল্পনায় রূপ নেয়। মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে রেশমী রুমাল আন্দোলন ছিল ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যে তুরস্ক ও আফগানিস্তানের মতো বিদেশী শক্তির সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার এক গোপন প্রচেষ্টা। কৃষক বিদ্রোহ, ধর্মীয় পুনর্জাগরণ এবং গোপন বিপ্লবী নেটওয়ার্ক—এই বহুমুখী উদ্যোগ ভারতের বৃহত্তর স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি স্থাপন করে এবং নিশ্চিত করে যে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রতিরোধের মশাল জ্বলতে থাকবে।

বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের পাশাপাশি আদিবাসীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন। ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ভারতের ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অন্যতম আদি ও তাৎপর্যপূর্ণ আদিবাসী অভ্যুত্থান। বর্তমান ঝাড়খণ্ড, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতালরা ঔপনিবেশিক প্রশাসনের মদদপুষ্ট শোষক রাজস্ব ব্যবস্থা, অত্যাচারী জমিদার এবং মহাজনদের দ্বারা নিপীড়িত ছিল। সিধু ও কানহু মুর্মু, এবং তাঁদের ভাই চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে সাঁওতালরা প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে; তারা জমিদার ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আক্রমণ করে এবং কোনো কোনো এলাকায় নিজেদের সমান্তরাল শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। যদিও ব্রিটিশ সেনাবাহিনী অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে, তবুও এটি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আদিবাসী সম্প্রদায়ের গভীর অসন্তোষকে প্রকাশ করে।

পরবর্তীতে ১৮৯৯-১৯০০ সালে বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডা বিদ্রোহ এই প্রতিরোধের চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। জমিদারী প্রথা এবং বন আইনের কারণে ভূমিহীন হতে থাকা মুন্ডারা ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারমুক্ত একটি “মুন্ডা রাজ” প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিরসার পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ হয়। বিরসা তাঁর আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের সাথে রাজনৈতিক সংহতিকে যুক্ত করেছিলেন এবং জনগণকে তাদের ঐতিহ্যগত প্রথায় ফিরে আসার ও ঔপনিবেশিক আধিপত্য প্রতিরোধের আহ্বান জানান। যদিও বিদ্রোহটি দমন করা হয় এবং ১৯০০ সালে বিরসা মুন্ডা কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন, তবুও তাঁর সংগ্রাম আদিবাসী পরিচয়, গর্ব এবং প্রতিরোধের এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার রেখে গেছে।

বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের নিপীড়িত জনগনের ধারাবাহিক সংগ্রাম পরবর্তীতে দুটো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। পলাশীর বিপর্যয়, বক্সারে পরাজয়, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, বালাকোট, নারিকেল বাড়িয়া ও সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে আজাদী আন্দোলন বুদ্ধিবৃত্তিক ধারায় চূড়ান্ত মুক্তির দোরগোড়ায় এসে পৌছায়।