নাজির আহমেদ চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতা ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তিনি প্রথম শহীদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্ররা ২ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ নাজির দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৪৩ থেকে শহীদ নজির দিবস উদযাপন করা শুরু করে। এছাড়াও শহীদ নজিরের স্মৃতি রক্ষায় তার বন্ধুরা সিদ্দিকবাজারে ‘শহীদ নাজির লাইব্রেরি’ নামে একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
নাজির আহমদ ১৩২৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (১৯১৮ সালের এপ্রিল) ফেনী জেলার দক্ষিণ আলিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শহীদ নজীর আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গৃহে। তিনি প্রথমে আরবী ও কু’রআন শিক্ষালাভ করেন। অতঃপর স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। দরিদ্রতার কারণে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় কষ্টের মধ্যে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে হাইস্কুলে ভর্তি হন। আর্থিক অনটন আর প্রতিকূল অবস্থার মুখোমুখি হয়েও তিনি শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখন। ১৯৩৭ সালে তিনি বৃত্তিসহ প্রবেশিকা পাস করেন। ১৯৩৯ সালে ফেনী কলেজ হতে আই.এ পাস করে তিনি ঢাকা আসেন। ঐ বছরই তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৪২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে সম্মান পরীক্ষার উত্তীর্ণ হন। ১৯৪৩ সালে তার এম.এ পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় নিহত হওয়ায় পর পরীক্ষা আর দেয়া হয়নি তার।
১৯৪৩ সালের জানুয়ারির শেষদিকে ছাত্রীদের একটি অনুষ্ঠানে 'বন্দে মাতরম' গাওয়া এবং পূজার্চনা বিধিকে কেন্দ্র করে হিন্দু এবং মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ও মুসলমান ছাত্ররা মোটাদাগে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একই বছরের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরাতন ভবনে) ক্লাস চলছিল। পূর্বের ঘটনার জের ধরে ক্লাস চলাকালীন হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে শুরু হলো সহিংসতা। লাঠিসোটা নিয়ে একদল আরেক দলের ওপর হামলা করে। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দুই দল আবির্ভূত হয় সম্মুখ সমরে। দুই দলেরই বেশ কিছু ছাত্র আহত হয়। মুসলিম ছাত্রনেতা নাজির আহমদ প্রতিপক্ষের হামলায়, ছুরিকাঘাতে আহত হন। তার বন্ধুরা তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করে কিন্তু বিরতিহীন রক্তক্ষরণের ফলে মাগরিবের সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বাংলা বিভাগের শিক্ষক কবি জসীম উদ্দীন সারাদিন তার শয্যাপাশে ছিলেন। নজীর আহমেদের স্মরণে কবি জসীম উদ্দীন একটি কবিতাও রচনা করেছিলেন। কবি লিখেছিলেন-
“নজীরের বাপ ফিরিয়া যাইবে আবার আপন ঘরে
নজীরের সেই শূন্য বিছানা বাক্স সঙ্গে ক'রে।
অর্দ্ধেক পড়া বইগুলি তার লেখা ও অলেখা খাতা,
পাতায় পাতায় স্মৃতি তার কত আখরের মত পাতা।’’
নাম: নাজির আহমদ
জন্ম তারিখ: ১৩২৪ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে (১৯১৮ সালের এপ্রিল)
স্থায়ী ঠিকানা: ফেনী জেলার দক্ষিণ আলিপুর গ্রাম
পেশা: শিক্ষার্থী ও রাজনীতিবিদ।
শাহাদাতের তারিখ: ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি
শাহাদাতের কারণ: সাম্প্রদায়িত দাঙ্গায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাত (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবন সংলগ্ন - বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরাতন ভবন)
শাহাদাতের স্থান: মিটফোর্ড হাসপাতাল, ঢাকা
সমাধিস্থল: আজিমপুর কবরস্থান