ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সহিংসতার শিকার হয়ে জীবন দেন বিশ্বজিৎ দাস। এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসের ৯ তারিখ রবিবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে। ছাত্রলীগের কর্মীরা বিশ্বজিৎ দাসকে বিনা কারণে প্রকাশ্য-দিবালোকে শত শত মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে নৃশংসভাবে হত্যা করে। ঐদিন সকাল থেকে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে সরকার বিরোধী আন্দোলন চলছিল। পেশায় দর্জি পঁচিশ বছর বয়সী যুবক বিশ্বজিৎ দাস জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা হেঁটে পার হওয়ার সময় আন্দোলবিরোধীরা তাকে শিবির ট্যাগ গিয়ে আঘাত হানা শুরু করে। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি ছাড়াও এই শীর্ণকায় যুবককে লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়। উপর্যুপরি চাপাতির কোপে তাকে ধরাশায়ী করে ফেলা হয়। তিনি বারবার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দূর্বৃত্তরা তাকে বারবার ধাওয়া দিয়ে আঘাত করতে থাকে। অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে হত্যকারীরা চলে যায়। তখন তাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। অত্যাধিক রক্তক্ষরণে অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।
বিশ্বজিৎ দাসের বাবার নাম অনন্ত দাস, মায়ের নাম মা কল্পনা রানী ঘোষ। সে ছিল শান্ত প্রকৃতির মানুষ। হাঙ্গামা-হুজ্জত একেবারেই পছন্দ করতো না। মিছিলে কখনো যায়নি। রাজনীতি করতো না। ২০০৬ সালে ঢাকার শাঁখারী বাজারে দর্জির কাজ শুরু করে বিশ্বজিৎ। দোকানের নাম ছিল নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্স। বড় ভাইয়ের দোকান। নিহত বিশ্বজিৎ দাসের শেষকৃত্য রোববার রাতেই শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর দাস পাড়া গ্রামে পারিবারিক শ্মশানে সম্পন্ন হয়।
২০১২ সালের ৯ই ডিসেম্বর ১৮ দলীয় জোট সরকারবিরোধী অবরোধ কর্মসূচির দেয়। এই কমর্সূচীর সমর্থনে সকাল ৯টার দিকে পুরোনো ঢাকা জজ কোর্ট থেকে সরকারবিরোধী আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করে। মিছিলটি ভিক্টোরিয়া পার্কের কাছে গেলে একটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও কবি নজরুল সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। আক্রান্ত আইনজীবীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এ সময় ধাওয়া খেয়ে পথচারী বিশ্বজিৎ দৌড়ে প্রথমে নিকটস্থ ভবনের দোতলায় অবস্থিত একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে আশ্রয় গ্রহণ করে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঐখানে ক্লিনিকে বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায়। নির্বিচার কিল-ঘুষি-লাথি চালানো হয়। তার গায়ে লোহার রড দিয়ে সজোরে আঘাত করা হয়। আহত বিশ্বজিৎ প্রাণ বাঁচাতে পাশের আরেকটি ভবনে ঢুকে পড়ে। পশ্চাদ্ধাবন করে সেখানেও বিশ্বজিতের ওপর হামলা চালায় সন্ত্রাসী ছাত্রলীগের কর্মীরা।
৮-১২ জনের একটি সন্ত্রাসী দল তাকে আঘাত করতে থাকে। তার কাপড় ছিঁড়ে যায়, সারা শরীরে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। সে আবার পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আঘাত অব্যাহত থাকে। সে এক পর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পথচারীদের কয়েকজন বিশ্বজিৎকে পাশের ন্যাশনাল হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগের কর্মীরা বাধা দেয়। প্রাণ বাঁচানোর শেষ চেষ্টায় উঠে দৌড় দেয়; কিন্তু শাঁখারীবাজারের একটি গলিতে গিয়ে ঢলে পড়ে যায়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় এক রিকশাওয়ালা তাকে নিকটস্থ মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যায়। অচিরেই মৃত্যু এসে তাকে সকল আক্রমণের ঊর্দ্ধে নিয়ে যায়।
এই ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তিনজন ছাত্রকে স্থায়ী বহিষ্কার ও দুই সাবেক ছাত্রের সনদপত্র বাতিল করে। দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলা পরিচালনা করা হয়। ২০১৩ সালের ৮ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক এ বি এম নিজামুল হক মামলার রায় ঘোষণা করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ২১ জন কর্মীর মধ্যে আটজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। বাকি ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড, এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন আদালত। তবে আসামীদের মধ্যে মাত্র আটজন গ্রেপ্তার ছিলেন, এবং বাকি ১৩ জন ছিলেন পলাতক।
পরবর্তীতে বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ড পাওয়া ৮ জনের মধ্যে ২ জন বেকসুর খালাস, ৪ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং মাত্র ২ জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। সেই সাথে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনালে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া দুইজন আসামীকেও খালাস দেওয়া হয়। মূল আসামীদের মধ্যে হাইকোর্টের রায়ের পরে সাজাপ্রাপ্ত আসামীর সংখ্যা ২১ থেকে ১৭তে নেমে আসে। গ্রেপ্তার হওয়া মাত্র একজনের মৃত্যুদন্ড, এবং ৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদন্ড রায় বহাল আছে। বাকি ১৩ জন এখনও পলাতক।
এক নজরে বিশ্বজিৎ দাসঃ
নাম: বিশ্বজিৎ দাস
পিতা: অনন্ত দাস
জন্ম: ২০০১ সাল
ভাই বোন : ২ ভাই
স্থায়ী ঠিকানা: শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর দাস পাড়া গ্রাম
পেশা: দর্জি
মৃত্যুর তারিখ: ৯ ডিসেম্বর ২০১২
মৃত্যুর কারণ: বিরোধী মত দমন, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সহিংসতা (জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা)
মৃত্যুর স্থান: মিটফোর্ড হাসপাতাল
শেষকৃত্য: শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর দাস পাড়া গ্রামে পারিবারিক শ্মশানে সম্পন্ন হয়।