তমসাচ্ছন্ন তারুণ্য ও দিশাহীন যুবসমাজ যখন বিপথগামী, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে হতাশাগ্রস্ত ও জরাজীর্ণ ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বের হাল ধরে বাংলাদেশের লাখো শিক্ষার্থীর কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দিতে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের যাত্রা শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে ৬ জন মেধাবী ছাত্রের হাত ধরে নব্য জাহিলিয়াতের মোকাবিলায় কুরআনের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ে এ অগ্রযাত্রার সূচনা ঘটে। এ অগ্রযাত্রার প্রথম পরশ এসে লাগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ প্রাঙ্গণে। ৮ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন কলা ভবনের ছাদে এক ছাত্রসমাবেশের মধ্য দিয়ে এ ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা হয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ ছাত্রদের মাঝে সংগঠন প্রাণচাঞ্চল্যের সঞ্চার করে এবং দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা। ফলে স্বল্প সময়েই ছাত্রশিবির এ ক্যাম্পাসে একটি জনপ্রিয় ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়, যদিও সংগঠনের এই অগ্রযাত্রা বাতিল শক্তির রোষানলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তী বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য র্যালিতে জাসদ ছাত্রলীগ, মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও ছাত্রইউনিয়নের কর্মীরা হামলা চালিয়ে বহু কর্মীকে আহত করে।
১৯৭৯ সালে জাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির ইলিয়াস-মাহবুব-কাশেম পরিষদের ব্যানারে অংশগ্রহণ করে বিপুল সমর্থন লাভ করে এবং ধারাবাহিক সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনের কার্যপরিধি ক্রমাগত বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯৮১ সালে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে মীর মশাররফ হোসেন হল শাখা আয়োজিত আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও বামপন্থী ছাত্রসংগঠন হামলা চালালে মনির, বেলাল, রব্বানী, বারীসহ একাধিক কর্মী আহত হন। সকল প্রতিবন্ধকতা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে ছাত্রশিবির আল্লাহর বাণী প্রচারের দায়িত্ব অব্যাহত রাখে এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে সাংগঠনিক মজবুতি অর্জনের মাধ্যমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনে পরিণত হয়।
একই সময়ে ক্যাম্পাসের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও সংগঠনের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়, যা বাতিল মতাদর্শের অনুসারীদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়। ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বর মাসে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা ছাত্রশিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়ে ২০ জন কর্মীকে আহত করে এবং ২০টি কক্ষ জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৮৮ সালে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা বিনা কারণে জহিরুল ইসলাম হাসনাত ভাইকে ছুরিকাঘাত করে এবং এসব সন্ত্রাসী ঘটনার কোনো বিচার হয়নি।
ছাত্রশিবিরের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় উদ্বিগ্ন হয়ে তৎকালীন ভিসি কাজী সালেহসহ আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকরা গোপন বৈঠকের মাধ্যমে যেকোনো উপায়ে শিবিরকে প্রতিহত করার নীলনকশা প্রণয়ন করেন। ১৯৮৯ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্রসংঘর্ষকে ইস্যু করে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা আল-বেরুনী হলের ১১০৭ নম্বর কক্ষে শিবির নেতা নাদির আহমেদের ওপর হামলা চালায় এবং পুনরায় হামলায় শাখা সভাপতি মমতাজুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ হোসেনসহ ২৫ জন গুরুতর আহত হন। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও ছাত্রদলের সশস্ত্র কর্মীরা নৃশংস হামলা চালায় ও অপহরণের চেষ্টা করে; একই ঘটনায় নিজ দলের হামলায় করিব নিহত হলেও তার দায় ছাত্রশিবিরের ওপর চাপানো হয়। প্রশাসনের মদদে ১৫ আগস্ট ১৯৮৯ তথাকথিত ২২ সংগঠন অগণতান্ত্রিক ও বেআইনিভাবে ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং ২৪ জন মেধাবী ছাত্রনেতাকে সার্টিফিকেট ছাড়াই ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
প্রকাশ্য কার্যক্রম সীমিত হয়ে গেলেও ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ওপর মারধর, নির্যাতন ও পুলিশে সোপর্দ করার ঘটনা অব্যাহত থাকে এবং শিবির সন্দেহে সাধারণ নামাজি ছাত্ররাও রেহাই পায়নি। ১৯৯৪ সালের ১৬ আগস্ট ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভাইভা দিতে আসা কামরুল ইসলামকে মওলানা ভাসানী হল থেকে ছাত্রদল সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায় এবং পানির জন্য আকুতি জানানো সত্ত্বেও তাকে পানি না দিয়ে ভোরের আগে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
১৯৯৫ সালের ৯ নভেম্বর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে ছাত্রশিবির ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে কর্মীরা “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি দিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে এবং সাধারণ ছাত্ররা একাত্মতা প্রকাশ করলে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা হল ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবে তৎকালীন ভিসি আমিরুল ইসলাম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের শিবিরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত প্রশাসন শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও অসহযোগিতা করে।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রভাব পড়েনি এবং দীর্ঘ সময় প্রকাশ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারলেও ছাত্রশিবির সামাজিক ও সেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের কাজ অব্যাহত রাখে। আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থা রেখে সংগঠন তার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে।
অবশেষে ৩৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সহস্র কর্মীর ত্যাগ, নিষ্ঠা, মেধা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পুনরায় প্রকাশ্য কার্যক্রম শুরু করে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ছাত্রশিবির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সুস্থ ধারার রাজনীতি অব্যাহত রাখা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত জাকসু’২৬ নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত “সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট” ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে। অতীত ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে একটি আদর্শবাদী দলকে কখনো অন্যায়ভাবে দমিয়ে রাখা যায় না। সত্য সমাগত হলে মিথ্যা দূরীভূত হয়। আল্লাহর দ্বীনকে এ জমিনে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ন্যায়-ইনসাফ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্রশিবির তার কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। সুতরাং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে—ইনশা-আল্লাহ।